TadantaChitra.Com | logo

২৫শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৬ বঙ্গাব্দ | ৯ই ডিসেম্বর, ২০১৯ ইং

গৃহকর্মী নীতিমালা হয়েছে আইন হওয়া জরুরি

প্রকাশিত : নভেম্বর ০৩, ২০১৮, ২১:৪৪

গৃহকর্মী নীতিমালা হয়েছে আইন হওয়া জরুরি

মাহফুজা আক্তার হ্যাপি নামে ১১ বছরের একজন মেয়েশিশু ঢাকার মিরপুরে কালশীর সাংবাদিক কলোনি এলাকার রাস্তায় অচেতন অবস্থায় পড়েছিল। তার মাথা ও পায়ে আঘাতের চিহ্ন। হাত-পাসহ সারা শরীরে অসংখ্য দাগ। এসব দাগের মধ্যে গরম খুন্তির ছ্যাঁকার দাগও রয়েছে। বাড়ি জামালপুরে। ঢাকায় এক গৃহকর্তার বাসায় সাত মাস আগে ও গৃহপরিচারিকার কাজ নেয়।

ওই গৃহকর্তা এবং তার স্ত্রী দ্বারা প্রায়ই নির্যাতনের শিকার হতে থাকে ও। তাদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে মাহফুজা আক্তার হ্যাপি ২০১৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টার দিকে ঘরের দরজা খোলা পেয়ে গৃহকর্তার বাড়ি থেকে বেরিয়ে আসে।

খন্দকার মোজাম্মেল হক নামে এক ব্যক্তি তাকে ওখানে অচেতন অবস্থায় রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখে মিরপুর থানায় নিয়ে যায়। তিনি নিজে বাদী হয়ে ওই দম্পতির বিরুদ্ধে মিরপুর থানায় নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) সেকশন- ৪(২) ধারায় ৬ সেপ্টেম্বর ২০১৫ তারিখে মামলা করেন। মামলার নম্বর-এনএসপি-৩৯/১৬।

পুলিশের কাছে মাহফুজা আক্তার হ্যাপি অভিযোগ করে, তাকে ঘরে আটকে রেখে নির্যাতন করত গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী। ৬ সেপ্টেম্বর রোববার গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী সকালে তাকে মারধর করে। মারের চোটে দরজা খোলা পেয়ে সে বাসা থেকে বের হয়ে কালশী এলাকায় গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ে।

এ মামলা প্রসঙ্গে আইনজীবী ফাহমিদা আক্তার বলেন, মাহফুজা আক্তার হ্যাপির মামলাটি নিষ্পত্তি হয়েছে। পুলিশের কাছে ও নির্যাতনের কথা স্বীকার করেছে। কিন্তু আদালতে বলেছে ওর গৃহকর্তা, গৃহকর্ত্রী ওকে নির্যাতন করেনি। তাকে নতুন জামাকাপড় দিয়েছে। খাবার দিয়েছে।

শিশু অধিকার ফোরাম নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী মাহফুজা আক্তার হ্যাপির মামলাটি পরিচালনা করেছে। এ প্রসঙ্গে শিশু অধিকার ফোরামের পরিচালক আব্দুছ সহিদ মাহমুদ বলেন, শিশু অধিকার ফোরাম গৃহকর্মে নিয়োজিত নির্যাতনের শিকার ১৫ গৃহকর্মী মেয়েশিশুকে আইনি সহায়তা দিয়েছে।

তাদের মধ্যে ঢাকার ওই বাড়ির গৃহকর্মে নিয়োজিত এই গৃহকর্মী মেয়েশিশুও রয়েছে। কিন্তু এই গৃহকর্মী মেয়েশিশুটি আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বলে গৃহকর্তা ও তার স্ত্রী তাকে কোনো নির্যাতন করেনি।

এতে প্রতীয়মান হয় যে, গৃহকর্তার পরিবারের পক্ষ থেকে মেয়েটির পরিবার অর্থের বিনিময়ে আপোষ চূড়ান্ত করেছে।

তিনি আরও বলেন, গৃহকর্মে শ্রম মেয়েশিশুদের আইনগত হিসেবে স্বীকৃত নয়। যেসব মেয়েশিশু গৃহকর্মী হিসেবে নিয়োজিত রয়েছে তাদের শ্রমকে শ্রম হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া প্রয়োজন।

তাদের শ্রম ঝুঁকিপূর্ণ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়া দরকার। সরকার নীতিগতভাবে স্বীকার করেছে এ শ্রম ঝুঁকিপূর্ণ কাজের মধ্যে পড়ে। গৃহকর্মী নীতিমালা হয়েছে। আইন এখনও হয়নি।

২০১৭ সালের এক তথ্যে জানা যায়, গৃহকর্মে নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৩২ জন শিশু। তাদের মধ্যে ০ থেকে ৬ বছরের মধ্যে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ জন, ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৬ জন, ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ২ জন।

ধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ৪ জন। নির্যাতনের কারণে মারা গেছে ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ২ জন, ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ১৩ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ১ জন।

শারীরিক নির্যাতনের পর মারা গেছে ৭ থেকে ১২ বছরের মধ্যে ১ জন এবং ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ২ জন।

শিশু অধিকার ফোরামের ২০১৪-১৫ সালের এক জরিপে জানা যায়, গৃহকর্মীদের মধ্যে শতকরা ১৭ ভাগ মেয়েশিশু যৌন নির্যাতনের শিকার হয়; নিয়োগকারীর পরিবারের পুরুষ সদস্য ও আত্মীয়স্বজনদের দ্বারা।

এছাড়া তারা শারীরিক নির্যাতনের পাশাপাশি মানসিক নির্যাতনেরও শিকার হয়। শারীরিক নির্যাতন বলতে চড় মারা, গরম খুন্তির ছ্যাঁকা দেয়া, কোনো কিছু দিয়ে পিটানো, দা-বটি দিয়ে জখম করা, চোখে আঘাত করা, দীর্ঘক্ষণ কাজ করানো, ধর্ষণ উল্লেখযোগ্য। মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে শিশুগৃহকর্মীর অভিভাবকদের নাম উল্লেখ করে গালি দেয়া, পর্যাপ্ত খাবার খেতে না দেয়া, পচা বাসি বা নিুমানের খাবার দেয়া, অনেক সময় খাবার খেতে না দেয়া, চিকিৎসা না করান, আত্মীয় পরিজনের সঙ্গে দেখা বা কথা বলতে না দেয়া উল্লেখযোগ্য।

জরিপের তথ্যানুযায়ী, গৃহকর্মী শিশুরা প্রতিদিন ১৪ থেকে ১৭ ঘণ্টা কাজ করে। তাদের সাপ্তাহিক কোনো ছুটি নেই। কেউ কেউ বছরে একবার তার বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে পারে।

অনেকে সেই সুযোগও পায় না। তাদের বিনোদনের ব্যবস্থা নেই এমনকি তারা টেলিভিশনও দেখতে পারে না। গৃহকর্মীদের নির্দিষ্ট কোনো ঘুমানোর জায়গা নেই। একেকদিন একেক জায়গায় ঘুমাতে দেয়া হয় যেমন রান্নাঘর, বারান্দা অথবা ডাইনিং স্পেসে। উৎসবে নতুন জামা দেয়া হলেও বছরের অন্যসময় তাদের পুরাতন পোশাক পরতে দেয়া হয়।

‘গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’ থাকা সত্ত্বেও কিছু কিছু বিষয়ে এখনও বাস্তবায়নের পর্যাপ্ত উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়নি। এর মধ্যে রয়েছে গৃহকর্মীদের সহায়তার জন্য পৃথক হেল্প লাইন সিস্টেম চালু।

নীতি প্রচারের জন্য প্রিন্ট ও ইলেক্টনিক গণমাধ্যমকে কাজে লাগাতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ। গৃহকর্মীদের সুরক্ষা ও কল্যাণে এফএম রেডিও, মোবাইল ম্যাসেজ, পোস্টারিং, লিফলেট, বুকলেট ইত্যাদির মাধ্যমে প্রচার চালানোর পদক্ষেপ গ্রহণ।

এছাড়া এ নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অধীনে কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটরিং সেল থাকা। সিটি কর্পোরেশনসমূহের ক্ষেত্রে আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তা এবং সিটি কর্পোরেশন এলাকা বাদে দেশের সব জেলা ও উপজেলায় যথাক্রমে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী অফিসারকে সভাপতি করে মনিটরিং সেল গঠন করার বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক, এমপি বলেন, একসময় নিয়োগকর্তাদের ইচ্ছানুযায়ী গৃহকর্মীদের চলতে হতো। পেটেভাতে গৃহকর্মীরা কাজ করত, এর কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে।

এখন অনেকেই গৃহকর্মীদের সম্মান ও শ্রদ্ধা করেন। অনেকে আবার নির্যাতন করেন এবং গৃহকর্মী শিশুটিকে মেরেও ফেলেন। কিন্তু তাদের কোনো বিচার হয় না। কারণ গৃহকর্মীরা দরিদ্র মানুষ। তাদের ক্ষতি হলে কেউ বলার নেই।

গৃহকর্মী নির্যাতনের ক্ষেত্রে আমরা আমাদের নেতিবাচক মানসিকতা থেকে বের হয়ে আসতে পারিনি। গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫’ তে বলা আছে, ১২ বছরের শিশুরা গৃহকর্ম হিসেবে হালকা কাজ করতে পারবে।

কিন্তু নতুন আইনে এটি পরিবর্তন করা হচ্ছে (১৪ বছরের নিচে কেউ কোনো ধরনের কাজই করতে পারবে না)। পাশাপাশি শিশুদের নিয়োগ জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

সচেতনতামূলক কার্যক্রম হিসেবে প্রচারের জন্য গৃহকর্মী সুরক্ষা ও নীতি বিভিন্ন সংবাদপত্রে প্রচার করা হয়েছে। তারপরও অনেকে জানেন না এ নীতিমালা সম্পর্কে। এটি মানার জন্য প্রয়োজন মন-মানসিকতার পরিবর্তন। সাংবাদিকসহ সবাইকে এটি নিয়ে কাজ করতে হবে। নীতি মানার জন্য সবাইকে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে।

শাপলা নীড়ের অ্যাডভোকেসি অফিসার নীনা শামসুন নাহার এর মতে, গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫ এ শিশু গৃহকর্মীদের বিষয়ে খুব স্বল্প পরিমাণে উল্লেখ করা হয়েছে। নিয়োগকারীর দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়া, আইনগত বাধ্যবাধকতা না থাকায় নীতি মানার ক্ষেত্রে চর্চার অপ্রতুলতা রয়েছে। নীতির সীমাবদ্ধতাগুলো নজরে এনে প্রয়োজনীয় সংস্কার করা দরকার।

শিশুদের বিষয় আরও বেশি বিবেচনায় আনা প্রয়োজন। সরকারের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গির কারণে গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি, ২০১৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে এর আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকায় সার্বিকভাবে আশানুরূপ ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

যত শিগগিরই সম্ভব একে আইনে পরিণত করা প্রয়োজন। গৃহকর্মী শিশুদের শ্রমকে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু শ্রমের আওতায় নিয়ে আসতে হবে। তাহলে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের জন্য চলমান প্রকল্পগুলো হতে গৃহকর্মী শিশুরা সুযোগ-সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে।

বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক ড. এএমএম আনিসুল আওয়াল এ বিষয়ে বলেন, গৃহকর্মীদের জন্য প্রভিডেন্ড ফান্ড গঠনের উদ্যোগটি ২০১৭ সালের মে মাসে বন্ধ হয়ে যায়।

এ উদ্যোগ বাস্তবায়ন হলে একজন গৃহকর্মী ১০০ টাকা এ ফান্ডে জমা দিলে সরকার থেকে ১০০ টাকা ওই ফান্ডে জমা দিত। একজন গৃহকর্মী ২৫ বছর এ টাকা জমা দিতে পারতেন। প্রধানমন্ত্রী বিষয়টি ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এটি বাস্তবায়িত হলে এক লাখ গৃহকর্মীকে এখন কভার করা যাবে না। অর্থ জমলে পুনরায় উদ্যোগ নেয়া হবে।

মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকী বলেন, মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মাল্টিসেক্টর প্রোগামের মাধ্যমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ রাজশাহী, চিটাগাং, সিলেট, বরিশাল, রংপুর, খুলনা ও ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ওয়ানস্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে সব ধরনের নির্যাতনের শিকার নারী ও শিশুকে চিকিৎসাসেবা ও আইনি সহায়তা দেয়া হয়।

এছাড়া ৪০টি জেলা, ২০টি উপজেলায় নারী নির্যাতন প্রতিরোধক সেল রয়েছে। এ সেবা প্রাপ্তদের মধ্যে গৃহকর্মী মেয়েশিশুও রয়েছে। ট্রমা কাউন্সিল সেন্টারেও মনোসামাজিক কাউন্সিলিংয়ের মাধ্যমে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য কাউন্সিলিং করা হয়। নির্যাতনের শিকার যেসব গৃহকর্মী মেয়েশিশুর থাকার জায়গা নেই তাদের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঠান হয়।

আমাদের টোল ফ্রি হেল্পলাইন ১০৯ নাম্বারেও যে কোনো সময়ে ফোন করলে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী মেয়েশিশুর যে কোনো সহযোগিতায় এগিয়ে যাবে। স্থানীয় প্রশাসন এবং থানার পুলিশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাদের উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হবে।

এছাড়া মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সেল শাখায় নারী ও শিশু নির্যাতন সংক্রান্ত মামলাগুলোর ফলোআপ করা হয়।


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

৪৭৩ ডিআইটি রোড তৃতীয় তলা, মালিবাগ রেইল গেট, ঢাকা-১২১৯

মোবাইলঃ ০১৯৭২৬৪৯৬১২, ০১৬২২৬৪৯৬১২

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

error: Content is protected !!