TadantaChitra.Com | logo

১৫ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৩১শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

দুর্নীতির মহারাজা এমপি জ্যাকব!

প্রকাশিত : ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০২০, ১৮:৪১

দুর্নীতির মহারাজা এমপি জ্যাকব!

তদন্ত চিত্রঃ ভোলা-৪ (চরফ্যাশন-মনপুরা) আসনের সাংসদ আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকবের বার্ষিক আয় ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ বেড়েছে বহু। পাঁচ বছর আগে যেখানে তাঁর কোনো বন্ড, ঋণপত্র বা কোম্পানির শেয়ার ছিল না, সেখানে এবার স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত কোম্পানিতে ৪৩ লাখ ২৭ হাজার ৫৬৪ টাকার ও তালিকাভুক্ত নয়, এমন কোম্পানির শেয়ার আছে ১২ কোটি টাকার (মধুমতি ব্যাংক)।

গত এগারো বছরে প্রায় ৪০০০ কোটি টাকার অধিক অবৈধ অর্থের মালিক হয়েছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় আওয়ামীলীগের নেতাকর্মীরা। গত এগারো বছরে জ্যাকবের শিক্ষাগত যোগ্যতাও বৃদ্ধি পেয়েছে সীমাহীন। রয়েছে নারী কেলেংকারী অভিযোগও। নারী নিয়ে আনন্দপূর্তি করতে চরফ্যাশন গড়ে তুলেছেন বাংলো। এখানেই ঢাকা থেকে নামীদামী মেয়ে নিয়ে পূর্তি করেন এমন অভিযোগ চরফ্যাশন এলাকায়। এ বিষয়ে আমাদের অনুসন্ধান চলছে। বিস্তারিত ২য় পর্বে…

২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি নির্বাচনী হলফ নামায় উল্লেখ্য করেছে এইচএসসি পাস। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হলফ নামায় উল্লেখ্য করেছেন তিনি এমএ পাস। অর্থাৎ বিপুল পরিমান অর্থ আত্মসাৎ এর সাথে সাথে তিনি শিক্ষাগত যোগ্যতার সনদও জালিয়াতি করেছেন। তিনি লিখেছেন বাংলাদেশ পিপলস ইউনিভার্সিটি থেকে সোসাল সাইন্স ইন পলিটিকাল সায়েন্স বিষয়ে এমএ পাস। যাহা এই জাতির শিক্ষার সাথে চরম প্রতারণা করা হয়েছে।

গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দূর্নীতি বিরোধী অভিযান শুরু করলে গত একমাসে জ্যাকব তার ক্যাশিয়ার চরফ্যাশন পৌরসভার মেয়র বাদল কৃষ্ণ দেবনাথ এর মাধ্যমে ন্যাশনাল ব্যাংক, মধুমতি ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংক চরফ্যাশন শাখার মাধ্যমে ৫২৬ কোটি টাকা বিএনপি নেতা আবদুল আউয়াল মিন্টুর লাল তীরের বিভিন্ন একাউন্টে প্রেরণ করেন।

স্থানীয় আওয়ামীলীগ সূত্রে জানা যায়, এমপি জ্যাকব চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলায় কোন স্থাপনা বঙ্গবন্ধু, শেখ হাসিনা কিংবা বঙ্গবন্ধু পরিবারের কোন সদস্যের নামে নামকরণ করেননি। দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ওয়ার্চ টাওয়ারটিও নিজের নামে করেছেন। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা নিজের নামে পরিবারের অন্য সদস্যদের নামে করেছেন। তার প্রমাণ এবার এমপিও ভুক্তির চরফ্যাশন ও মনপুরার ১৩ টি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর সবকটি তার নামে, তার পিতা-মাতা ও স্ত্রীর নামে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ও সড়ক পরিবহন সেতুমন্ত্রী চরফ্যাশন গিয়ে তাদের বক্তব্যে বলেছেন চারিদিকে শুধু জ্যাকব আর আর জ্যাকব। জ্যাকব ছাড়া এই এলাকায় কারো নামে কোন স্থাপনা নেই, এটা খুবই ভাল।

চরফ্যাশন এর মুসল্লিরা জানান, চরফ্যাশন এর সবচেয়ে বড় মসজিদ খাসমহল মসজিদ। এই মসজিদের মিনার উদ্বোধন করা হয় মক্কা নগরীর আমিরকে দিয়ে। পরবর্তীতে সেই মিনার এর নকশা পরিবর্তন করে করা হয়েছে জ্যাকব টাওয়ার। যাহা সম্পূর্ণ ইসলাম পরিপন্থী কাজ।

দক্ষিণ আইচার একজন চাষী জানান, আমাদের বাড়ী-ভিটা জোর করে দখল করে, এখানকার সাধারণ মানুষকে অসহায় ভেবে এমপি সাহেব প্রায় ১৫০ বিঘা জমি দখল করে তুলেছেন বিশাল খামার বাড়ী। সেখানে ঐ অঞ্চলের অসহায় পরিবারের উঠতি বয়সী সুন্দরী তরুণীদের নিয়ে যাওয়া হয় মনোরঞ্জনের জন্য। এই কাজে তাকে রসুলপুর এর মিন্টু চেয়ারম্যান নামের একজন সহযোগিতা করে যাচ্ছেন। চরফ্যাশন সরকারি কলেজের সুন্দরী মেয়েদের নিয়ে যাওয়া হয় খামার বাড়ীতে এমপি ও ঢাকা থেকে আগত এমপির মেহমানদের খুশি করার জন্য। এখানকার ভুয়া অধ্যক্ষ প্রভাষক কয়সর আহমেদ দুলাল ও বিউটি নামের একজন শিক্ষক এই কাজে সহযোগিতা করে থাকেন। এমপি সাহেব মাঝে মধ্যেই হেলিকপ্টার যোগে তার নিজস্ব মেহমানদের নিয়ে খামার বাড়ী আসেন, বসান আসর। শুরু হয় গান বাজনা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় একজন অধ্যাপককে চরফ্যাশন সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে আদেশ জারী করেন। কিন্তু এমপি অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে ভুয়া অফিসার ইনচার্জ দুলাল কে আবার কলেজের দায়িত্ব
দেওয়া হয়।

চরফ্যাশন বাজারের একজন ব্যবসায়ী জানান, জেলা পরিষদ এর জায়গায় এমপি সাহেব প্রায় ৫০০ দোকান তৈরী করে প্রতি দোকান থেকে তার ক্যাশিয়ার মেয়র এর মাধ্যমে ৪০ লক্ষ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা নেন। এই দোকান থেকেই এমপি নিয়েছেন ৩০ কোটি টাকা। জ্যাকব টাওয়ার এর নামে জেলা পরিষদ ও জলবায়ু ট্রাষ্ট এর ২২ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে। জলবায়ু ট্রাষ্ট এর টাকা ২০% করে নিয়ে তিনি ২০০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে জানিয়েছেন জলবায়ু মন্ত্রণালয়। তিন হাজার কোটি টাকার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ব্লক এর কাজ থেকে ২০% করে এমপি ৪০ কোটি টাকা নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন ঠিকাদার। কাজের মান খারাপ হওয়ায় ত্বত্তাবধায়ক প্রকৌশলী তোফায়েল আহমেদ দীর্ঘদিন কাজ বন্ধ রাখেন।

জানা গেছে, ঢাকার মিরপুর সেকশন ১২, রোড-২, ব্লক-বি, বাড়ী নম্বর ২৬, পিত্রালয় নামে এমপি সাহেব গড়ে তুলেছেন বিশাল আলিশান ১২ তলা বাড়ী। যেখানে রয়েছে ৪৮ টি ফ্ল্যাট। খরচ করেছেন ১০ কোটি টাকা। স্ত্রী নীলিমা জ্যাকব বসবাস করেন বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার বিশাল আলিশান ফ্ল্যাটে। যার মুল্য ৫ কোটি টাকা। ধানমন্ডি আবাসিক এলাকায় রয়েছে ৩টি ফ্ল্যাট, যার মুল্য ৯ কোটি টাকা। ১৫০ কোটি টাকা খরচ করে গাজীপুরে তৈরি করেছেন বাগানবাড়ী। সেখানে উঠতি নায়িকা, মডেলসহ রূপবতীদের রূপে মনোরঞ্জনের ব্যাবস্থা। বড় মাপের আমলা, রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনিক ব্যাক্তিদের খুশি করার ব্যবস্থাও করেছেন।

এছাড়াও জ্যানিক ফিসারিজ নামে নরসিংদী শ্বশুরালয়ে ৪৫ বিঘা জমিতে গড়ে তুলেছেন বিশাল খামার। খরচ করেছেন ১০ কোটি টাকা। কানাডায় ছোট ভাই বাবুর কাছে ৩০০ কোটি টাকা পাচার করেন। এই অপরাধে কানাডার আদালত বাবুকে ৬ মাসের জেল দেন। অস্ট্রেলিয়ায় তার মেজো ভাই সৌরভ এর মাধ্যমে ৫০০ কোটি টাকা পাচার করে গড়ে তুলেছেন বিশাল বাড়ী। মালয়েশিয়ায় ৩০০ কোটি টাকা খরচ করে মার্কেট কিনেছেন। করেছেন সেকেন্ড হোম। ৫০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হয়েছেন মধুমতী ব্যাংক এর পরিচালক।

তার কথিত এপিএস শরীফ এর একাউন্টের মাধ্যমে গত এগার বছরে এমপি জ্যাকব ৫০০ কোটি টাকা চরফ্যাশন থেকে ঢাকার বিভিন্ন একাউন্টে এনেছেন। চরফ্যাশন ও মনপুরায় তার রয়েছে ১৭ টি ইটের ভাটা। এমপি ঢালচর, চরকুকরি, চরপাতিলা, মজিব নগর চরে দখল করে নিয়েছেন ৫০০ বিঘা জমি। জমির মালিকেরা এমপির ভয়ে মুখ খুলছেন না।

এমপি জ্যাকবের ভাস্যমতে তিনি গত এগার বছরে চরফ্যাশন ও মনপুরায় ৫০০০ কোটি টাকার কাজ করিয়েছেন। এই কাজ থেকে তিনি ২০% করে ১০০ কোটি টাকা নিয়েছেন। স্থানীয় একজন চেয়ারম্যান জানান, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা, গর্ভকালিন ভাতা, মৎস্য ভাতা ও কাবিখার টাকা থেকে এমপি ৭০% টাকা নিয়ে যান। যেই চেয়ারম্যান স্বাক্ষর করবেন না, পরের বার তিনি আর চেয়ারম্যান হতে পারবেন না বলে হুমকি দেন।

চরফ্যাশন সদরের একজন চেয়ারম্যান জানান, এমপি জ্যাকব প্রতি চেয়ারম্যান এর মনোনয়ন দিতে নেন ৪০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা। তাকে টাকা দিলে এখানে ওসমানগঞ্জ এর ফোটন চেয়ারম্যান এর মতো বহু বিএনপি জামাত এর লোক মনোনয়ন পান। এমপি জ্যাকব গত এগারো বছরে প্রায় ৮০ টি দেশে ভ্রমন করেছেন। গত এগার বছরে হেলিকপ্টার যোগে চরফ্যাশন মনপুরায় আশা যাওয়ায় খরচ করেছেন ২০ কোটি টাকা।

স্থানীয় আওয়ামীলীগের একজন পরীক্ষিত নেতা জানান, চরফ্যাশন ও মনপুরায় জ্যাকব পদপদবী ধারী একশত জনের মতো আওয়ামীলীগে অনুপ্রবেশ ঘটিয়েছেন। উপজেলা আওয়ামীলীগের কমিটিতে সহ সভাপতি শাহেদ আলী মিয়া, রতন মিয়া, দপ্তর সম্পাদক মনির উদ্দিন চাষী, অর্থ সম্পাদক ইউনুস আল মামুন, পৌর আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শুভ্র মনির, ফোটন চেয়ারম্যান সহ বিএনপি-জামাত এর ২৭ জনকে পদ দিয়েছেন।

স্থানীয় একাধিক আওয়ামীলীগের নেতা জানান, এমপি জ্যাকব বিএনপির ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান বকশি এন্টারপ্রাইজ, ইউনুস আল মামুন লিমিটেড, মিলন এন্টারপ্রাইজ সহ কয়েকটি ফার্ম দিয়ে সকল কাজ করান। আওয়ামীলীগের ত্যাগী নেতাকর্মীদের কোন কাজ দেন না। আবার যে সকল কাজের ফান্ড নেই সে সকল কাজ নেতাকর্মীদের দিয়ে ২০% টাকা নিয়ে তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছেন। যেই এমপি ২০০৮ সালে নির্বাচনের হলফ নামায় ৫ লক্ষ টাকা দেনা দেখালো, সে কিভাবে এগারো বছরে এতো অর্থ সম্পদ এর মালিক হলো। তাই চরফ্যাশন ও মনপুরার জনগণ এই দূর্নীতি বিরোধী অভিযানে অবিলম্বে, এই দশ-এগারো বছরে শূন্য থেকে দূর্নীতির মহারাজা হয়ে হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়া এমপির সকল অর্থ সম্পদ উপার্জনের উৎস দুদক ও এনবিআর এর মাধ্যমে অনুসন্ধনের দাবি জানান।

তবে এব্যাপারে এমপি জ্যাকবকে ফোন করেও তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

সংবাদটি শেয়ার করুন...


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

৪৭৩ ডিআইটি রোড তৃতীয় তলা, মালিবাগ রেইল গেট, ঢাকা-১২১৯

মোবাইলঃ ০১৬২২৬৪৯৬১২

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

তদন্তচিত্র কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।