TadantaChitra.Com | logo

৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের দুই সার্ভেয়ারের মাসিক অবৈধ আয় ৬০ লক্ষ টাকা!

প্রকাশিত : আগস্ট ১০, ২০২০, ১৮:০১

নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের দুই সার্ভেয়ারের মাসিক অবৈধ আয় ৬০ লক্ষ টাকা!

বিশেষ প্রতিবেদক: কলংকের শেষ নেই নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরে। ঘুষ গ্রহনের সময় দুদকের ফাঁদে পর পর তিন জন প্রকৌশলী গ্রেফতার হলেও টনক নড়ছে না অন্যান্য কর্মকর্তাদের। তারা কিছুদিন নিরব থেকে আবার স্বমূর্তি ধারণ করেছেন। নানা কৌশল প্রয়োগ করে ঘুষ দুর্নীতির দোকান খুলে বসেছেন। তাদের শাসন করার জন্য একজন ডিজি থাকলেও তিনিও দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের দলে ভিড়ে টুপাইস কামিয়ে নিতে ব্যাস্ত। এসব বিষয় নিয়ে বার বার জাতীয় দৈনিক ও বেসরকারী টিভি চ্যানেলে রিপোর্ট প্রচার হলেও ঘুমিয়ে আছেন নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী ও সচিব। এ যেন মগের মল্লুক! যে যেভাবে পারো লুটে পুটে খাও।

সর্বশেষ নৌপরিবহন অধিদপ্তরের দুই নৌপ্রকৌশলী ও সার্ভেয়ারের বিরুদ্ধে প্রায় একডজন গুরুতর অভিযোগ জমা পড়েছে নৌ পরিবহন মনন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে। এসব অভিযোগের বিষয়ে অনুসন্ধান চালিয়ে সত্যতাও পাওয়া গেছে। জানাগেছে, নৌপরিবহন অধিদপ্তরের নারায়ণগঞ্জ অফিসের নৌ প্রকৌশলী ও শীপ সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেন এবং খুলনার নৌ প্রকৌশলী ও শীপ সার্ভেয়ার মাহবুবুর রশীদ মুন্না অবৈধপথে কেবলমাত্র নৌযান সার্ভে খাতেই প্রতিমাসে কমপক্ষে ৬০ লক্ষ টাকা অবৈধ আয় করছেন। কর্মস্থলে যোগদানের পর থেকেই তারা অভিনব কায়দায় সরকারী রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে নিজেদের পকেট ভারি করছেন। অন্যদিকে নৌপথে চলাচলকারী মানুষের জীবন বিপন্নের পথ সুগম করে দিচ্ছেন। সরকার যে লক্ষ্য অর্জনে তাদেরকে নিয়োগদান করেছে এবং বেতন ভাতা দিচ্ছে সেই লক্ষ্যের বিপরীত মেরুতে তারা অবস্থান নিয়েছেন। এতেকরে সরকার যেমন রাজস্ব আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমন নৌযান মালিকরাও ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। সব থেকে বড় আশংকার কথা হল- নৌপথের যাত্রীদের জীবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে এই দুই দুর্নীতিবাজ নৌ প্রকৌশলী ও শীপ সার্ভেয়ারের কারণে।

অভিযোগের বর্ণনায় জানা গেছে, এই দুই নৌ প্রকৌশলী সাবেক দুই দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলী যথাক্রমে মইন উদ্দিন জুলফিকার ও এস এম নাজমুল হকের স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন। তাদের পদাংক অনুস্মরণ করে এবং পরামর্শ মোতাবেক নানা কৌশলে অনিয়ম -দুর্নীতি করে যাচ্ছেন। তাদের সম্পর্ক প্রভুভক্ত গুরু- শিষ্যের মতই বিদ্যমান। প্রায় দিনই তারা সন্ধ্যারপর ঢাকা বনশ্রী আফতাব নগরের একটি নির্জন বাড়ীতে অথবা তিন তারকা হোটেলে একত্রে মিলিত হয়ে শলাপরামর্শ করেন। কিভাবে অতি অল্প সময়ে কোটি কোটি টাকার মালিক হওয়া যায় তার দীক্ষা নিয়ে থাকেন। নৌ সেক্টরের বারোটা বাজিয়ে নিজেদের বিত্তবিলাসী জীবন পরিচালনার মাষ্টারপ্ল্যান করা নিয়েই ব্যস্ত থাকছেন।

সুত্রমতে, এই দুই প্রকৌশলী প্রতিদিন গড় ৩০ টি করে নৌযান সার্ভে করে থাকেন। নথিপত্র ঘেটে দেখা গেছে, খুলনার সার্ভেয়ার মুন্না প্রতিদিন ২০ টি ও নারায়ণগঞ্জের সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেন প্রতিদিন ১০/১৫ টি নৌযানের সার্ভে করেছেন। আর এসব নৌযানের সার্ভে ও ফিটনেস সনদ প্রদান বাবদ জাহাজের প্রকারভেদে প্রতিটি থেকে ঘুষ নেন ৩০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। এক্ষেত্রে তারা পুরাতন, অকেজো, লক্করঝক্কর, মেয়াদ উত্তির্ণ নৌযানের মালিকদের সাথে দালাল মাধ্যমে দামদর নির্ধারণ করে থাকেন।

আরো জানা গেছে, ৩০ বছরের উর্ধে বয়সি জাহাজ নামে মাত্র নকশা জমা রেখে জাহাজের কাঠামো ও যান্ত্রিক পরীক্ষা- নীরিক্ষা না করেই ওই জাহাজকে ৫/৭ লক্ষ টাকার বিনিময়ে নতুন জাহাজ হিসাবে রেজি: প্রদান করা হচ্ছে। অন্যদিন নৌযানের গ্রসটন কমিয়ে পরস্পর যোগসাজষে জাল জালিয়াতির মাধ্যমে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ৩০/৪০ মিটার দৈর্ঘের মালবাহী ও বালুবাহী জাহাজকে ২৮/৩০ মিটার দৈর্ঘ মাপে রেজি: প্রদান করে সরকারের কোটি কোটি টাকা রাজস্ব আত্মসাৎ করছেন। ২০১৮ -২০১৯ -২০২০ অর্থ বছরে নতুন রেজি: প্রদানকৃত মালবাহী ও বালূবাহী নৌযানগুলোর ফাইল নীরিক্ষা করলেই এই জাল জালিয়াতির প্রমান মিলবে।

অন্যদিকে যেসমস্ত নৌযানের উপকুল অতিক্রমের যোগ্যতা নেই সেই সমস্ত নৌযানকে অর্থের বিনিময়ে উপকুল অতিক্রম বা চলাচলের অনুমতি প্রদান করে প্রতিটি থেকে ৫০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা উৎকোচ আদায় করা হচ্ছে।

এছাড়া নৌ পরিবহন অধিদপ্তরের প্রশাসনিক আদেশ থাকা সত্বেও নৌযানের মালিকানা পরিবর্তনে বিধি ভংগ করে ৭/৮ লাখ টাকার বিনিময়ে মালিকানা পরিবর্তন করে রেজি: সনদ প্রদান করা হচ্ছে। এ সংক্রান্ত বিধি হল: জাহাজ নির্মাণেরপর ২ বছরের মধ্যে মালিকানা পরিবর্তন করা যাবে না। অথচ নানা অজুহাতে সেই বিধি ভংগ করা হচ্ছে।

আরো জানা গেছে, জাহাজ নির্মাণ হওয়ার আগেই সরে জমিনে পর্যবেক্ষণ না করেই অর্থের বিনিময়ে সার্ভে এবং রেজি: প্রদান করা হচ্ছে। কিললেইংক বা জাহাজ নির্মাণের স্ট্রাকচার পর্যবেক্ষণ না করেই কিললেইংক সনদ ইস্যু করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে জাহাজ প্রতি নেওয়া হচ্ছে ৩/৪ লক্ষ টাকা।

উল্লেখ্য যে, সাবেক শীপ সার্ভেয়ার মইনুদ্দিন জুলফিকার ও সার্ভেয়ার শাহরিয়ার হোসেন দুই জনই বুয়েটের প্রাক্তন ছাত্র এবং নেভাল আর্কিটেক্ট। যে কারণে দুই জনের মধ্যে গভীর সম্পর্ক রয়েছে। সেসুত্র ধরেই মইনুদ্দিন জুলফিকার নৌযানের নকশা অনুমোদন, সার্ভে ও রেজিস্ট্রশনের দালালি করেন। এজন্য মতিঝিলের বিআইডব্লিউটিএ অফিসের কাছেই একটি অফিস ভাড়া নিয়েছেন। তাদের দু’জনের মোবাইল কল লিষ্ট পরীক্ষা করলেই এসব দুর্নীতির প্রমান মিলবে।

সুত্রমতে, নারায়ণগঞ্জের নৌ প্রকৌশলী শাহরিয়ার হোসেনের ফ্যামেলী ঢাকায় থাকেন। তিনি কোন দিনও দুপুর ২ টার আগে নারায়ণগঞ্জ অফিসে যান না। আবার ৫ টার আগেই বাসায় ফিরে আসেন। তা হলে তিনি প্রতিদিন ১০ টি করে নৌযান কখন সার্ভে করেন। তিনি প্রতিটি ত্র“টিপূর্ণ নৌযানের সার্ভে সনদ দিতে ঘুষ নিচ্ছেন ৩০ হাজার থেকে ১ লক্ষ টাকা। রেজি: বাবদ নিচ্ছেন ১ থেকে ৩ লক্ষ টাকা। আর এসব মক্কেল জোগাড় করে দিচ্ছেন সাবেক সার্ভেয়ার মইনুদ্দিন জুলফিকার। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শাহরিয়ার হোসেন গত এক বছরে ৩ হাজার নৌযান সার্ভে ও রেজি: দিয়েছেন। হেড অফিসের ফাইল চেকআপ করলেই তার প্রমান মিলবে।

অন্যদিকে খুলনার শীপ সার্ভেয়ার মাহবুবুর রশীদ মুন্না সাবেক ভারপ্রাপ্ত প্রধান প্রকৌশলী (ঘুষ গ্রহনের দায়ে সাময়িক বরখাস্ত) এস এম নাজমূল হকের অতি প্রিয় সাগরেদ বা ডান হাত হিসাবে নৌ অধিদপ্তরে পরিচিত। তারা দুইজন একই গোয়ালের গরু হিসাবে খ্যাত। দু’জনের চরিত্রেরও ভীষন মিল রয়েছে।

সাবেক নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের সাথে প্রকৌশলী এস এম নাজমুল হকের দহরম মহরম সম্পর্ক থাকাকালে বাংলাদেশ শিপিং কর্পোরেশন থেকে মাহবুবুর রশীদ মুন্নাকে নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে এটাচমেন্টে নিয়ে আসেন। শর্ত থাকে যে, নাজমুলের কথামত তিনি সব কাজ করবেন। মুন্নাও সেই শর্তে অংগীকারবদ্ধ হয়েই নৌ পরিবহন অধিদপ্তরে যোগদানের সুযোগ পান। সেই থেকে তাদের মধ্যে গুরু শিষ্য সম্পর্ক বিদ্যমান। সেটি আজো অটুট রয়েছে। দুদকের ফাঁদে ঘুষের ৫ লক্ষ টাকাসহ নাজমুল গ্রেফতার হয়ে কারাগারে নিক্ষিপ্ত হলেও মুন্না কিন্ত আজো ধরা ছোয়ার বাইরে রয়েছেন। তিনি খুলনার দায়িত্বে থাকার সুবাদে নাজমুলের প্রেসক্রিপশন মোতাবেক ফাইল ওয়ার্ক করছেন। ফলে নাজমূল ক্ষমতার বাইরে থেকেও ঠিক আগের মতই সার্ভে ও রেজি: বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন। কেবল সার্ভে আর রেজি: নয়, তিনি মাষ্টার ,ড্রাইভার পরীক্ষাতেও সমানতালে পাশ বানিজ্য করে যাচ্ছেন। তার সকল প্রকার কর্মে সাহায্য করছেন এই মাহবুবুর রশীদ মুন্না।

জানা গেছে, মাহবুবুর রশীদ মুন্নার পোষ্টিং খুলনায় হলেও তার ফ্যামেলী থাকে ঢাকায়। ফলে তিনি সপ্তাহে মাত্র ৩ দিন খুলনায় অবস্থান করেন। বাকী ৪ দিন থাকেন ঢাকায়। তিনি বনশ্রীর আফতাব নগরের একটি ফ্ল্যাট কিনেছেন বলে শোনা যায়। এই ফ্লাটে বসেই যত দুনম্বরী কাজ আছে সেগুলো সমাধান করেন। ফ্ল্যাটটিতে এস এম নাজমূলও নিয়মিত আসা যাওয়া করেন। সরেজমিনে না গিয়ে এখানে বসেই নৌযানের কাগজপত্র সহি -সম্পাদনা করেন। এই ফ্ল্যাটে নৌ অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তাও মাঝে মধ্যে মেহমান হয়ে থাকেন বলে গুঞ্জন রয়েছে। মুন্না কাগজপত্র যাচাই বাছাই না করে এমন কি জাহাজটি না দেখেই ঢাকায় বসে প্রতিদিন গড়ে ২০ টি জাহাজ সার্ভে করেছেন যা একটি অবিশ্বাস্য ঘটনা। গত এক বছরে তিনি প্রায় ৬ হাজার নৌযান সার্ভে করেছেন। হেড অফিসের ফাইল নীরিক্ষা করলেই তার প্রমান পাওয়া যাবে। আর এসব মক্কেল যোগাড় করে দিয়েছেন ঘুষ নেওয়ার অপরাধে বরখাস্ত থাকা প্রকৌশলী এস এম নাজমূল হক। শাহরিয়ারের মত মুন্নাও এক একটি ক্রুটিপূর্ণ জাহাজ সার্ভে সনদ দিতে ৩০ হাজার থেকে শুরু করে ১ লক্ষ টাকা নিয়ে থাকেন। আর রেজি: বাবদ প্রতি নৌযানে নেন ১ লক্ষ টাকা। সম্প্রতি এই নাজমুলের তদবীরেই মুন্নাকে ঢাকার সদরঘাটের মত লোভনীয় পদে বদলী করা হয়েছে। গত সপ্তাহেই তিনি সদরঘাটে যোগদান করেছেন। এখন নাজমুল আর মুন্না মিলে প্রধান কার্যালয়কেও গ্রাস করার মাষ্টার প্ল্যান তৈরী করছেন বলে অনেকেই মন্তব্য করেছেন।

সম্প্রতি এসব অভিযোগ উলে­খপূর্বক ঢাকার লাল মাটিয়ার জনৈক এনামূল হক দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবরে লিখিতভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন। এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য ২ নৌ প্রকৌশলীর সেল ফোনে কল করলে তারা উভয়েই অভিযোগগুলো অসত্য ও বানোয়াট বলে দাবী করেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন...


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

৪৭৩ ডিআইটি রোড তৃতীয় তলা, মালিবাগ রেইল গেট, ঢাকা-১২১৯

মোবাইলঃ ০১৬২২৬৪৯৬১২

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

তদন্তচিত্র কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।