TadantaChitra.Com | logo

১৮ই ফাল্গুন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ৩রা মার্চ, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

নাঙ্গলকোটে আতঙ্কের নাম জুলিয়াছ বাহিনী

প্রকাশিত : জানুয়ারি ২৩, ২০২১, ০৮:০৫

নাঙ্গলকোটে আতঙ্কের নাম জুলিয়াছ বাহিনী

“যুবলীগ নেতা পরিচয়ে একের পর এক অপকর্ম, অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, জমি দখল, নারী নির্যাতন ও অপহরণের অভিযোগ” 

নিজস্ব প্রতিবেদক : কুমিল্লার নাঙ্গলকোটে মূর্তিমান আতঙ্কের নাম জুলিয়াছ বাহিনী। এ বাহিনীর চালক আবু সুফিয়ান জুলিয়াছ এলাকায় বাহিনীর প্রধান হিসেবে পরিচিত। জুলিয়াছ উপজেলার আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়ক এবং তুগুরিয়া গ্রামের মৃত রুহুল আমিনের ছেলে। ভুক্তভোগীদের দাবি, এমন কোনো অপরাধ নেই, যা জুলিয়াছ ও তার বাহিনীর সদস্যরা করেনি। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজি, মানুষকে পিটিয়ে ও কুপিয়ে পঙ্গু করা, মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা, নারী নির্যাতন, অপহরণ, জমি দখলসহ বিভিন্ন অপরাধ ও অপকর্মে জড়িত সে। কেউ মামলা করলে অস্ত্র ঠেকিয়ে তা প্রত্যাহারে বাধ্য করা হয়।

জানা যায়, কিছু বখাটে, মাদকসেবী এবং সন্ত্রাসী নিয়ে আদ্রায় একটি বাহিনী গঠন করেছে যুবলীগ নেতা আবু সুফিয়ান জুলিয়াছ। ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়কের পরিচয় ভাঙিয়ে সে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। ভুক্তভোগীরা জুলিয়াছ ও তার বাহিনীর বিরুদ্ধে থানায় মামলা করলেও রহস্যজনক কারণে ব্যবস্থা নেয়া হয় না। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আবু সুফিয়ান জুলিয়াছ।

তিনি বলেছেন, আমি ইউনিয়ন যুবলীগের আহ্বায়কের পদে আছি। এলাকার কিছু লোক ষড়যন্ত্র করে আমার বিরুদ্ধে কয়েকটি মামলা দিয়েছে। এসব ঘটনায় আমি জড়িত নই। এখন এলাকার বাইরে রয়েছি। আমি যেন এলাকায় যেতে না পারি, সে জন্যই একটি মহল মিথ্যা অভিযোগ করছে।

উপজেলার তুগুরিয়া গ্রামের সফিউল হক বলেন, ২০১৩ সালে জুলিয়াছ বাহিনীর প্রধান জুলিয়াছ আমার কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। রাজি না হওয়ায় সে ও তার লোকজন আমাকে ও আমার ভাই ছেরাজুল হককে তুগুরিয়া ব্রিজের ওপর পেয়ে কোপায়। পরে আমরা কুমিল্লা মেডিকেলে দীর্ঘদিন চিকিৎসা নেই।

এর কিছুদিন পরেই আমার ভাই মারা যান। এ ঘটনায় আমরা আদালতে মামলা করি। কিন্তু তাদের ভয়ে কেউ মামলায় সাক্ষী দেয়নি। তিনি বলেন, জুলিয়াছের নেশাই হল চাঁদাবাজি। কেউ চাঁদা না দিলে পিটিয়ে ও কুপিয়ে পঙ্গু করে দেয়া হয়। এই গ্রামের কমপক্ষে ২০ জনকে পঙ্গু করেছে সে। কেউ তার ভয়ে মুখ খোলার সাহস পায় না।

ওই গ্রামের আবদুর রহমান খোকন বলেন, ২০১৭ সালে চাঁদার জন্য জুলিয়াছ লোকজন নিয়ে আমার বাড়িতে হামলা করে। এরপর তারা আমাকে ও পরিবারের ৫ জনকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করে। ওরা আমার পা ভেঙে ফেলে। এ ঘটনায় আমার ছেলে আদালতে মামলা করে। পিবিআই তদন্ত শেষে আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জশিট দেয়। এরই মধ্যে চলতি বছরের শুরুতে সে আমার ছেলের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে মামলা তুলে নিতে বাধ্য করে।
আদ্রা দক্ষিণ ইউনিয়নের ফাহিম হোসেন বলেন, জুলিয়াছ এলাকায় প্রভাব বিস্তারের জন্য ত্রাস সৃষ্টি করে। সে ২০১৯ সালের মার্চ মাসে আমাকে তুলে নিয়ে পিটিয়ে পা ভেঙে ফেলে। আমি এখনও স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারছি না।

তুগুরিয়া গ্রামের আবদুল মন্নান বলেন, জুলিয়াছ ও তার বাহিনীর সদস্যরা গত ১৮ জানুয়ারি আমার মেয়েকে অপহরণ করে। এ ঘটনায় আমি থানায় মামলা করে সুবর্ণচর থেকে মেয়েকে উদ্ধার করি। ২৬ জুলাই সে আমার কাছে ৩ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। না দেয়ায় আমাকে পিটিয়ে আহত করে ওরা। কুমিল্লা মেডিকেলে চিকিৎসার জন্য গেলে সেখানেও আমার ওপর হামলা হয়। এ ঘটনায় করা মামলাটি বর্তমানে ডিবি পুলিশ তদন্ত করছে।

মনোহরগঞ্জের উত্তর হাওলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবদুল হান্নান হিরন বলেন, জুলিয়াছ ও তার বাহিনীর সদস্যরা ৬-৭ মাস আগে চাঁদার জন্য তুগুরিয়া এলাকায় আমার গাড়িতে হামলা করে। ওই ঘটনায় আমি নাঙ্গলকোট থানায় মামলা করেছি।

তুগুরিয়া গ্রামের মাহফুজুল হক বলেন, চাঁদা না দেয়ায় আমার হার্ডওয়্যার দোকানে দু’বার হামলা করে জুলিয়াছ। এরপর আমার বাড়ির সামনে এসে আমাকে পিটিয়েছে। তার ভয়ে মামলা করতে পারিনি।

একই গ্রামের বোরহান উদ্দিন বলেন, জুলিয়াছ ও তার বাহিনীর সদস্যরা ২০১৯ সালে পিটিয়ে আমার ভাইয়ের কোমর ও মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়। সে এখনও বিছানায় শুয়ে দিন পার করছে। গ্রামের সেলিম বলেন, আমার শ্বশুর ৭ বছর আগে মারা যায়। এরপর জুলিয়াছ বাহিনী তুগুরিয়া বাজারে আমার শ্বশুরের দুটি দোকান দখল করে নেয়। তাদের ভয়ে কোনো কথা বলতে পারছি না।

এলাকার মেম্বার জসিম উদ্দিন বলেন, জুলিয়াছ বাহিনী আমার একটি দোকান দখল করে নিয়েছে। এমন কোনো অপরাধ নেই, যা তারা করে না। জুলিয়াছের কাছে নোয়াখালীর দেলোয়ারও কিছু না।

সাবেক মেম্বার এনায়েত উল্লা বলেন, আমার বয়স ৮০ বছর। সে আমাকেও মেরেছে। বাড়িতে আগুন দেয়ার ভয় দেখিয়ে জুলিয়াছ বাহিনী আমার স্ত্রীর কাছ থেকে চাঁদা নিয়েছে। সে এলাকায় মাদক ও অস্ত্রের ব্যবসা করে। তার ভয়ে কেউ কথা বলে না।

মনোহরগঞ্জের উত্তর হাওলা গ্রামের এক নারী বলেন, জুলিয়াছ বিভিন্ন সময় আমাকে কুপ্রস্তাব দিত। রাজি না হওয়ায় সে আমার ওপর নির্যাতন চালায়। আমি এ ঘটনায় এসপি অফিসে অভিযোগ করেছি। আদ্রা দক্ষিণের লুদুয়া গ্রামের আবুল বাশার বলেন, আমি পাকা ভবন করার সময় সে চাঁদা দাবি করে। চাঁদা দিতে রাজি না হওয়ায় সে আমার ভাতিজা ওমরকে পিটিয়ে আহত করেছে।

আদ্রা উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান তাজুল ইসলাম বলেন, জুলিয়াছের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, মানুষকে পিটিয়ে হাত-পা ভেঙে ফেলাসহ বিভিন্ন অভিযোগ আমাদের কাছেও এসেছে। নাম প্রকাশ না শর্তে স্থানীয় কয়েকজন জানান, জুলিয়াছ অপরাধ করেও এলাকায় বীরের মতো ঘুরে বেড়ায়। প্রশাসনও তাকে কিছুই বলে না।

জানতে চাইলে জেলা ডিবি পুলিশের এসআই নজরুল ইসলাম বলেন, জুলিয়াছসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে হওয়া একটি চাঁদাবাজির মামলা আমরা তদন্ত করছি। শিগগির আদালতে মামলাটির প্রতিবেদন দেয়া হবে।

নাঙ্গলকোট উপজেলা যুবলীগের আহ্বায়ক ও পৌর মেয়র আবদুল মালেক বলেন, জুলিয়াছের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ আসায় তাকে দল থেকে বাদ দেয়া হয়েছে। সে এখন যুবলীগের কেউ নয়।


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

৪৭৩ ডিআইটি রোড তৃতীয় তলা, মালিবাগ রেইল গেট, ঢাকা-১২১৯

মোবাইলঃ ০১৬২২৬৪৯৬১২

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

তদন্তচিত্র কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।