জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বিশ্বের দেশগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম হলো জাতিসংঘের জলবায়ু সম্মেলন বা কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (COP)। প্রতিবছর জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC)-এর সদস্য দেশগুলো এই সম্মেলনে অংশ নেয়। ২০২৬ সালের COP31 অনুষ্ঠিত হবে তুরস্কের আন্তালিয়ায়।
COP-এর পূর্ণরূপ Conference of the Parties বা ‘কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ’। এটি ১৯৯২ সালে গৃহীত জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন (UNFCCC)-এর সর্বোচ্চ সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী সংস্থা।
UNFCCC-এর সদস্য সব দেশই COP সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করে। প্রতিবছর অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে দেশগুলো জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নিজেদের নেওয়া পদক্ষেপ পর্যালোচনা করে, বৈশ্বিক অগ্রগতি মূল্যায়ন করে এবং প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।
জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বৈশ্বিক লক্ষ্য নির্ধারণ, দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি জোরদার এবং সম্মিলিত পদক্ষেপ এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে COP বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বহুপক্ষীয় প্ল্যাটফর্ম।
COP-এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সদস্য দেশগুলোর জমা দেওয়া জাতীয় প্রতিবেদন ও গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের তথ্য পর্যালোচনা করা।
এসব তথ্যের ভিত্তিতে COP মূলত তিনটি বিষয় মূল্যায়ন করে—
এই পর্যালোচনার মাধ্যমে দেশগুলোর মধ্যে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও সহযোগিতা নিশ্চিত করার চেষ্টা করা হয়।
বিগত কয়েক দশকে COP-এর বিভিন্ন অধিবেশন থেকে বৈশ্বিক জলবায়ু নীতিতে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত এসেছে। এর মধ্যে কিয়োটো প্রটোকল এবং প্যারিস চুক্তি অন্যতম। এসব চুক্তি জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক নীতির গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
COP31 হলো UNFCCC-এর ৩১তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ। ২০২৬ সালের ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আন্তালিয়ায় এই সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে।
২০২৫ সালে ব্রাজিলের বেলেমে অনুষ্ঠিত COP30-এর ধারাবাহিকতায় COP31-এর অন্যতম লক্ষ্য হলো আগের সম্মেলনগুলোর সিদ্ধান্ত ও প্রতিশ্রুতিকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া। একই সঙ্গে জলবায়ু বিষয়ে দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্য তৈরি এবং কার্যকর পদক্ষেপ ত্বরান্বিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্টের জারি করা নির্দেশনার মাধ্যমে দেশটির পরিবেশ, নগরায়ণ ও জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী মুরাত কুরুমকে COP31-এর প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
আগের সম্মেলনগুলোর প্রতিশ্রুতিকে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে COP31 মূলত তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে গুরুত্ব দেবে।
প্যারিস চুক্তির আওতায় দেশগুলোকে তাদের সংশোধিত জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (NDC) বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে নেওয়া হবে। গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর লক্ষ্যে দেশগুলোর নেওয়া পদক্ষেপ বাস্তবে কতটা কার্যকর হচ্ছে, সেটিও গুরুত্ব পাবে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোকে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহায়তা করতে অর্থায়ন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। COP29-এ নির্ধারিত নতুন সমষ্টিগত জলবায়ু অর্থায়ন লক্ষ্য বাস্তবায়নের ওপর COP31-এ বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে।
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা দেশ ও জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা বাড়ানোও COP31-এর অন্যতম অগ্রাধিকার। বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, খরা, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি ও অন্যান্য জলবায়ু ঝুঁকির সঙ্গে খাপ খাওয়াতে অভিযোজন ও সহনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ জোরদার করা হবে।
COP31 আয়োজনের জন্য তুরস্ককে বেছে নেওয়ার পেছনে দেশটির ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সংযোগস্থলে অবস্থানের কারণে জলবায়ু কূটনীতিতে তুরস্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান তৈরি করেছে।
পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং সার্কুলার ইকোনমি বা চক্রাকার অর্থনীতি নিয়ে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান উদ্যোগও COP31 আয়োজনের প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব পাচ্ছে।
সব মিলিয়ে COP31-এর মূল লক্ষ্য হবে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক প্রতিশ্রুতিগুলোকে আরও কার্যকর বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া। emisiones কমানো, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অভিযোজন সক্ষমতা বাড়ানোর ক্ষেত্রে সম্মেলনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।