
বিশ্বজুড়ে আবারও শক্তিশালী এল নিনো আবহাওয়া চক্র শুরু হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে খরা, ফসলহানি এবং চারণভূমি সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) ও বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি)। সম্ভাব্য এই সংকট মোকাবিলায় ঝুঁকিপূর্ণ ২২টি দেশের প্রায় ৮৮ লাখ মানুষের জন্য ২০ কোটি ২০ লাখ ডলারের আগাম সহায়তা তহবিলের আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাগুলো।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা (ডব্লিউএমও) জানিয়েছে, আসন্ন এল নিনো স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি শক্তিশালী হতে পারে। এফএও গত ৪১ বছরের স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখিয়েছে, অতীতে তীব্র এল নিনো চলাকালে কোন কোন অঞ্চলে সবচেয়ে ভয়াবহ কৃষিভিত্তিক খরা দেখা দিয়েছিল।
এফএওর বিশ্লেষণে দেখা গেছে, আফ্রিকার সাহেল অঞ্চল, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং মধ্য আমেরিকা সবচেয়ে বেশি খরার ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব অঞ্চলের অনেক এলাকায় কৃষিজমি ও চারণভূমিতে খরার সম্ভাবনা ৫০ শতাংশেরও বেশি।
২০১৫-১৬ এবং ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোতেও এসব অঞ্চলে ব্যাপক ফসলহানি, গবাদিপশুর মৃত্যু, খাদ্য সংকট এবং মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটেছিল।
এফএওর প্রাকৃতিক সম্পদবিষয়ক কর্মকর্তা হোর্হে আলভার-বেলত্রান বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা, সংঘাত এবং খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার কারণে এবারের এল নিনোর প্রভাব আগের তুলনায় আরও ভয়াবহ হতে পারে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কৃষিখাতে সম্ভাব্য ক্ষতির বড় অংশই নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে পড়বে। দক্ষিণ আফ্রিকা অঞ্চলে নামিবিয়া, বতসোয়ানা, অ্যাঙ্গোলা, জাম্বিয়া, জিম্বাবুয়ে, মোজাম্বিক, মাদাগাস্কার ও দক্ষিণ আফ্রিকার বিস্তীর্ণ এলাকায় খরার আশঙ্কা সবচেয়ে বেশি।
এফএওর তথ্য অনুযায়ী, আগের এল নিনো চক্রে এ অঞ্চলে ৬ কোটির বেশি মানুষ মানবিক সহায়তার প্রয়োজনীয়তায় পড়েছিলেন এবং লাখো মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি হন।
সাহেল অঞ্চলে চলমান সংঘাত ও দীর্ঘস্থায়ী খাদ্য সংকটের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। সেনেগাল, মৌরিতানিয়া, ঘানা, টোগো, বেনিন, নাইজেরিয়া, ইথিওপিয়া ও সুদানের বিস্তীর্ণ এলাকায় কৃষিভিত্তিক খরার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে মধ্য আমেরিকার ড্রাই করিডোর, হাইতি, কিউবা, ডোমিনিকান রিপাবলিক, কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলাও উচ্চ ঝুঁকির তালিকায় রয়েছে।
এশিয়ার ক্ষেত্রে ভারত, পাকিস্তান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া ও পূর্ব তিমুরে বৃষ্টিনির্ভর কৃষি সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এতে ধান, ভুট্টাসহ গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যশস্য উৎপাদনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এফএও জানিয়েছে, উন্নত স্যাটেলাইটভিত্তিক মানচিত্র ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগেভাগেই চিহ্নিত করা সম্ভব হচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকারগুলো প্রয়োজনীয় সহায়তা, উন্নত বীজ, পশুখাদ্য, সেচ ও নগদ সহায়তা দ্রুত সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে দিতে পারবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো সতর্কতা ও আগাম প্রস্তুতি নিলে কৃষকরা খরা-সহনশীল ফসল নির্বাচন, রোপণের সময় পরিবর্তন এবং পানি ও পশুখাদ্য সংরক্ষণের মতো পদক্ষেপ নিয়ে ক্ষতি অনেকটাই কমিয়ে আনতে পারবেন।
