শিশু হাসপাতালে হাম-ডেঙ্গুর চাপ, মশা নিয়ন্ত্রণ নিয়েও প্রশ্ন

লেখক: সাব এডিটর
প্রকাশ: ৪২ minutes ago

হাম ও ডেঙ্গু আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসাসেবা দিতে চাপ বাড়ছে রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে এসব রোগে আক্রান্ত শিশুদের নিয়ে হাসপাতালে আসছেন স্বজনরা। অনেককে বেডের জন্য অপেক্ষা করতে হচ্ছে, আবার কেউ কেউ এক হাসপাতাল থেকে অন্য হাসপাতালে ঘুরেও ভর্তি হতে পারছেন না। ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিয়েও অভিযোগ রয়েছে রোগীর স্বজনদের।

সম্প্রতি শ্যামলীতে অবস্থিত বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কয়েকজন শিশুর স্বজন জানান, জ্বর, সর্দি-কাশি, নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার মতো উপসর্গ নিয়ে প্রথমে বিভিন্ন হাসপাতাল ও চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার পর অনেক শিশুর শরীরে হাম বা ডেঙ্গু শনাক্ত হচ্ছে। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাদের শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসা হচ্ছে।

হামে আক্রান্ত এক শিশুকে নিয়ে কয়েক দিন ধরে হাসপাতালে থাকা এক স্বজন জানান, প্রথমে শিশুটির ডায়রিয়া ও জ্বরের চিকিৎসা চলছিল। পরে ঠান্ডা, কাশি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া হয়। একপর্যায়ে পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হলে শিশুটিকে বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়। বর্তমানে শিশুটি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন।

আরেক শিশুর স্বজন জানান, প্রায় ১০ দিন ধরে জ্বর ও ঠান্ডায় ভুগছিল শিশুটি। স্থানীয় একটি হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও জ্বর না কমায় তাকে শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরীক্ষায় হাম শনাক্ত হয়েছে। চিকিৎসায় বর্তমানে শিশুটির অবস্থা আগের তুলনায় ভালো এবং চিকিৎসকেরা ছাড়পত্র দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

আরেক পরিবারের সদস্য জানান, হাম আক্রান্ত শিশুর আগে জ্বর, ঠান্ডা ও পরে নিউমোনিয়া ধরা পড়ে। শারীরিক অবস্থা খারাপ হওয়ায় তাকে শিশু হাসপাতালে পাঠানো হয়। শুরুতে আইসিইউতে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হলেও ব্যয় বহন করা সম্ভব না হওয়ায় ওয়ার্ডেই চিকিৎসা চালানোর অনুরোধ করেন স্বজনরা। পরে শিশুটিকে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দেওয়া হয়।

এদিকে, অনেক অভিভাবক হাসপাতালে এসেও তাৎক্ষণিকভাবে বেড বা চিকিৎসকের দেখা পাচ্ছেন না। এক শিশুর স্বজন জানান, প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ঠান্ডা ও কাশিতে ভুগছে শিশুটি। অন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসেন। তবে জরুরি বিভাগে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

একই পরিবারের দুই শিশু ডেঙ্গু আক্রান্ত

হাসপাতালে একই পরিবারের দুই শিশুর ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও রয়েছে। তাদের একজনের বয়স কয়েক মাস এবং অন্যজনের বয়স কয়েক বছর। প্রথমে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়ার চিকিৎসা চললেও পরে পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। এর আগে তারা একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। ব্যয় বেশি হওয়ায় পরে শিশু হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়।

ডেঙ্গু আক্রান্ত আরেক শিশুর স্বজন জানান, শিশুটির জ্বর ১০৪ ডিগ্রি ফারেনহাইটের কাছাকাছি উঠেছিল এবং শরীরে ব্যথাও ছিল। পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়ার পর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসার পর বর্তমানে তার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো।

ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মশা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অভিযোগ

ডেঙ্গু আক্রান্ত এক শিশুর স্বজন অভিযোগ করেন, হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার আগে কয়েকটি হাসপাতালে বেডের জন্য ঘুরতে হয়েছে। পরে শিশু হাসপাতালে বেড পাওয়া গেলেও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।

ডেঙ্গু ওয়ার্ডে মশার উপস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। তার অভিযোগ, অনেক জানালা খোলা থাকে এবং মশা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা পর্যাপ্ত নয়। শিশুকে মশার কামড় থেকে রক্ষা করতে নিজেদের উদ্যোগে মশারি কিনে আনতে হয়েছে বলেও জানান তিনি।

স্বজনদের দাবি, ডেঙ্গু রোগীদের ওয়ার্ডে নিয়মিত মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করা, জানালায় নেটের ব্যবস্থা করা এবং রোগীদের মশারি সরবরাহ করা প্রয়োজন। এতে চিকিৎসাধীন শিশুদের নতুন করে মশাবাহিত সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো সম্ভব হবে।

বেড সংকট সামলাতে হিমশিম হাসপাতাল

হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসার জন্য আসে। ফলে অনেক সময় নতুন রোগীকে তাৎক্ষণিকভাবে বেড দেওয়া সম্ভব হয় না। কোনো রোগীকে চিকিৎসা দিয়ে ছাড়পত্র না দেওয়া পর্যন্ত একই বেডে নতুন রোগী ভর্তি করানোও সম্ভব নয়। এ কারণে জরুরি বিভাগে রেখেও অনেক শিশুর চিকিৎসা দিতে হয়।

তিনি জানান, হাম ও ডেঙ্গু—দুই ধরনের রোগীই হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসছে। কোনো সময় একটি রোগের প্রকোপ বাড়লে ওই রোগে আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেড়ে যায়। গত বছর ডেঙ্গু রোগীর চাপ বেশি থাকায় আলাদা ডেঙ্গু সেল করা হয়েছিল। এবার হাম আক্রান্ত শিশুর সংখ্যা বেশি হওয়ায় মিজেলস রোগীদের জন্য আইসিইউ প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে সেখানে হাম আক্রান্ত ৯৯ জন শিশু ভর্তি রয়েছে। আর ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছে ৩৯ জন। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তনশীল হওয়ায় রোগীর সংখ্যা যেকোনো সময় বাড়তে বা কমতে পারে।

শিশু বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের জ্বর, শরীরে র‍্যাশ, শ্বাসকষ্ট, অতিরিক্ত দুর্বলতা, বমি বা পানিশূন্যতার মতো উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে ডেঙ্গু প্রতিরোধে শিশুদের মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা এবং ঘর ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সংবাদটি শেয়ার করুন...