TadantaChitra.Com | logo

১৪ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৮শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

করোনায় বিলুপ্তির পথে শিক্ষা ব্যবস্থা

প্রকাশিত : জুলাই ০৬, ২০২১, ১৮:১৬

করোনায় বিলুপ্তির পথে শিক্ষা ব্যবস্থা

।।মোল্লা তানিয়া ইসলাম তমা।।

মনে হয় এবারই প্রথম দেশের ইতিহাসে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নতুন প্রথম বর্ষে (নিউ ফার্স্ট ইয়ার) শিক্ষার্থী বিহীন। কারণ, ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষে কোনো শিক্ষার্থীই ভর্তি করতে পারেননি দেশের বিশ্ববিদ্যালয় গুলো। গেল বছর অটোপাসের মাধ্যমে আমিসহ যারা এইচএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছি তাদের সকলেরই প্রথমবর্ষে ভর্তি হওয়ার কথা। কিন্তু করোনার কারণে এখনও ভর্তি পরীক্ষা নিতে পারেননি কোন বিশ্ববিদ্যালয়। সঠিক সময়ে ভর্তি কার্যক্রম শেষ হলে গত বছরের অক্টোবর-নভেম্বর থেকে আমাদের ক্লাস শুরু হয়ে যেত। করোনায় শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষয়ক্ষতির এটি সামান্য একটি চিত্রমাত্র। আমার দৃষ্টিতে করোনার ছোবলে বিলুপ্তির পথে দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা। টানা প্রায় ১৭ মাস ধরে বন্ধ দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। চরম ক্ষতির শিকার প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যায়ের প্রায় সাড়ে চার কোটি শিক্ষার্থী ও সেই সাথে প্রায় ৫০ লাখ শিক্ষক। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতিও কম নয়। বেসরকারি শিক্ষকদের আয়ের ওপর পড়েছে করোনার ভয়াবহ নেতিবাচক প্রভাব। ব্যাপক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, বেড়েছে বাল্যবিয়ে। শহরে শিশু-কিশোর শিক্ষার্থীরা ঘরে বন্দি হয়ে থাকতে থাকতে নানা মানসিক সংকটের সম্মুখীন। এসব নিয়ে উদ্বিগ্ন অভিভাবকরাও। বৈশ্বিক মহামারি করোনা ভাইরাসের কারণে গত বছরের ১৭ মার্চ থেকে প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। এরপর সরকার সংসদ টেলিভিশন, বেতার ও অনলাইনে ক্লাস নেওয়ার উদ্যোগ নেয়। তবে সব শিক্ষার্থী এ সুবিধা পাচ্ছেন না।

করোনায় শিক্ষা খাতের ক্ষতির চিত্র উঠে এসেছে কয়েকটি বেসরকারি সংস্থার ভিন্ন ভিন্ন জরিপেও। গণসাক্ষরতা অভিযানের সমীক্ষা অনুযায়ী, ৩১ শতাংশ শিক্ষার্থী অনলাইন ও দূরশিক্ষণ বা বেতার, টেলিভিশন, অনলাইনের বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম এবং মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দেওয়া পাঠদানের আওতায় এসেছে। যদিও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি ৯২ শতাংশ আর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দাবি ৬৫ শতাংশ শিক্ষার্থী টেলিভিশনের পাঠদানের আওতায় এসেছে। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) যৌথ গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ ও মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী করোনার এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনার একদম বাইরে রয়েছে। এ গবেষণায় এমন প্রেক্ষাপটে মা-বাবাদের চিন্তাভাবনার চারটি মৌলিক দিক উঠে এসেছে। এগুলো হলো- শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়া, শিক্ষার খরচ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়া, স্কুল খোলার সময় নিয়ে চিন্তা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানজনিত উদ্বেগ।

 

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশিদা কে চৌধুরী মন্তব্য করেছেন, করোনায় ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প, অর্থনীতি, স্বাস্থ্য ইত্যাদি খাতের ক্ষতি চোখে দেখা যায়। কিন্তু শিক্ষার ক্ষতি দৃশ্যমান হতে থাকে ধীরে ধীরে। বিভিন্ন গবেষণায় যেসব তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাচ্ছে তা গভীর উদ্বেগজনক। শিক্ষার জন্য তা অশনিসংকেত। শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক সবার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রাথমিক স্তরে পাঠগ্রহণকারী শিশুদের শিক্ষা, শারীরিক ও মানসিক দিকের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এই করোনায়। শহরে ফ্ল্যাটবাড়িতে বন্দি কোমলমতি শিশুরা স্কুলের আনুষ্ঠানিক পাঠগ্রহণ ও বন্ধু-সহপাঠীদের সংস্পর্শ থেকেও বঞ্চিত। অভিভাবকরা জানাচ্ছেন, রাত জেগে গেমস খেলা, অনলাইন ক্লাসে অনাগ্রহ, মেজাজ খিটখিটে হওয়া, ঘুম কমে যাওয়াসহ নানা সমস্যায় ভুগছে তারা। অন্যদিকে প্রাথমিকে গ্রামের শিশুরা অনলাইন ক্লাস থেকে বঞ্চিত। করোনার কারনে হয়নি ২০২০ সালের পি এস সি ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বার্ষিক পরীক্ষাগুলোও। রাজধানীর তুরাগের ধউর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোঃ গোলাম কিবরিয়া বলেন, করোনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীদের। প্রাথমিকে শিক্ষার কারিকুলাম অনুযায়ী নির্দিষ্ট পাঠ পরিকল্পনা অনুসরণ করে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান করতে হয় এবং শিখন-শেখানো কার্যক্রম থেকে শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন সবকিছু ক্লাসেই শেষ করা হয়।

বেশিরভাগ শিক্ষার্থী, বিশেষত গ্রামাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের বাইরে বিশেষ করে বাড়িতে খুব একটা লেখাপড়ার সুযোগ পায় না। বর্তমান কারিকুলাম অনুযায়ী পাঠদানে বা শিক্ষার্থীদের পড়ানোর বিষয়ে গ্রামাঞ্চলের অভিভাবকরা খুব বেশি সক্ষম নন। তিনি বলেন, সবচেয়ে বেশি ক্ষতির শিকার দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা। কারণ দ্বিতীয় শ্রেণিতে তিনটি বইয়ের ওপর সরাসরি ক্লাস করতে না পারায় বুক ইয়ের ওপর সরাসরি ক্লাস করতে না পারায় বুক রিডিং ও রাইটিংয়ে তারা প্রয়োজনীয় শিখনফল অর্জন করতে পারেনি। ফলে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠে তাদের জন্য ৬-৭টি বই পড়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করা কষ্টকর হয়ে উঠছে। বিদ্যালয় খোলার পর এই শিশুদের রিডিং দক্ষতা অর্জন করাতে অনেক কষ্ট হবে। অনেকে বিদ্যালয়ে আসতে চাইবে না। এতে ঝরে পড়ার হার বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। করোনায় অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে বিভিন্ন পাড়া-মহল্লার কিন্ডারগার্টেন স্কুলগুলোও। ভাড়া বাড়িতে অল্প পুঁজি নিয়ে পথচলা এসব স্কুলের বিরাট একটি অংশ বন্ধ হয়ে গেছে। শিশু শিক্ষার্থীরা অবাক বিস্ময়ে দেখছে, যে স্কুলে লেখাপড়া করত, সেটি রাতারাতি উধাও হয়ে গেছে। তুরাগের রাজাবাড়ি এলাকার ইমারসন স্কুল এন্ড কলেজের অধ্যক্ষ আসাদুজ্জামান (জামান স্যার) বলেন, সারাদেশে প্রায় ৬৫ হাজার কিন্ডারগার্টেন স্কুল ছিল। এর অন্তত অর্ধেক করোনাকালে বন্ধ হয়ে গেছে। এগুলোর শিক্ষক ও স্টাফরা না খেয়ে, একবেলা আধপেটা খেয়ে কোনো রকমে বেঁচে আছেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, করোনায় দেশের মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষতিও ভয়াবহ। গত বছর কোনো বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই উপরের শ্রেণিতে উঠেছে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা। ফলে গত বছরের ক্লাসের দক্ষতা ঘাটতি তাদের রয়েই গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বছরে নতুন ক্লাসের পড়াশোনা। অথচ স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় আনুষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ নেই। সামর্থ্যবান অভিভাবকরা গৃহশিক্ষক দিয়ে পড়াচ্ছেন। তবে শিক্ষকের কাছে দিনে এক ঘণ্টা পড়ে বিদ্যালয়ের ৬-৭ ঘণ্টা ঘাটতি পূরণ হওয়ার নয়। অন্যদিকে করোনায় নিম্নবিত্ত ও দরিদ্র অসংখ্য অভিভাবকের আয়ে ধস নেমেছে। তাই তারা সন্তানের জন্য গৃহশিক্ষক রাখতে পারছেন না। গত বছর এসএসসি পাস করা শিক্ষার্থীরা কলেজে একাদশ শ্রেণিতে ভর্তি হলেও এক দিনও ক্লাসে বসতে পারেনি।

করোনায় গত বছরের এইচএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা বাতিল হয়ে যায়। ২০২১ সালের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা কবে নেওয়া সম্ভব হবে কেউ জানে না। এদের মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার্থীরা নবম শ্রেণিতে সরাসরি ক্লাস করেছে, দশম শ্রেণিতে ক্লাস পেয়েছে মাত্র আড়াই মাস। তাদের প্রিটেস্ট ও টেস্ট কোনো পরীক্ষাই হয়নি। সবাই তাকিয়ে আছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কবে খুলবে। অথচ করোনাকাল ক্রমেই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। অনলাইন শিক্ষা কখনও ক্লাসরুম শিক্ষার বিকল্প নয়। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদের বিপদ আরও বেশি। এটা আমরা ভালো করেই জানি। সবচেয়ে বড় কথা পড়ালেখা যাই হোক, শিক্ষার্থীরা ঘরবন্দি থাকতে থাকতে দিন দিন অসুস্থ হয়ে পড়ছে।

অভিভাবকরা প্রতিনিয়ত শিক্ষকদের কাছে জানতে চান, কবে স্কুল খুলবে, শিক্ষার্থীরা অনলাইনে ক্লাস করতে করতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে, মনোযোগ রাখতে পারে না। মেজাজ তাদের খিটখিটে হয়ে যাচ্ছে। আয় হারিয়ে অনেক অভিভাবক গ্রামের বাড়িতে চলে গেছেন। শিক্ষকরাও স্কুলে আসেন নিজেদের মতো। শৈথিল্য তাদের পেয়ে বসেছে। এভাবে আর কত দিন? শহরের স্কুল-কলেজগুলো অনলাইনে ক্লাস নিচ্ছে, গ্রামের প্রতিষ্ঠানগুলো সেটা করতে পারছে না। এতে শিক্ষায় বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি হচ্ছে। আমার দৃষ্টিতে গ্রামে করোনার প্রভাব অনেক কম। সেখানকার স্কুল-কলেজগুলো খুলে দেওয়া যায় কিনা, সরকার তা ভেবে দেখতে পারেন। উচ্চশিক্ষা স্তরেও করোনার থাবায় বিপর্যস্ত শিক্ষার্থীরা। সেশনজট জেঁকে বসেছে। শিক্ষার্থীরা তাদের শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায়। বয়স পেরিয়ে যাচ্ছে, আছে চাকরির চিন্তা।

সেশনজট কাটাতে এক বছর অপেক্ষা করার পর বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন চলতি মাসে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অনলাইনে পরীক্ষা নেওয়ার অনুমতি দিয়েছে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে এ অনুমতি গত বছরই দেওয়া হয়েছিল। করোনা সংক্রমণ কমে আসায় ডিসেম্বর-জানুয়ারিতে বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স শেষ সেমিস্টার ও মাস্টার্সের বেশ কয়েকটি পরীক্ষা হয়। কিন্তু অন্য সেমিস্টারগুলোতে কিছু ক্লাস হলেও পরীক্ষা হয়নি। বন্ধ রয়েছে উচ্চতর গবেষণাও। ২৯ লাখ ছাত্রছাত্রী নিয়ে পরিচালিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও সঙ্গীন।


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

৪৭৩ ডিআইটি রোড তৃতীয় তলা, মালিবাগ রেইল গেট, ঢাকা-১২১৯

মোবাইলঃ ০১৬২২৬৪৯৬১২

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

তদন্ত চিত্র কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েব সাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।