TadantaChitra.Com | logo

৭ই জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩১ বঙ্গাব্দ | ২১শে মে, ২০২৪ খ্রিস্টাব্দ

উত্তরায় মানছে না ডিসির হুশিয়ারী, পুলিশের নামে সক্রিয় চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট!

প্রকাশিত : মার্চ ২৮, ২০২৪, ০৭:৪৯

উত্তরায় মানছে না ডিসির হুশিয়ারী, পুলিশের নামে সক্রিয় চাঁদাবাজ সিন্ডিকেট!

তদন্ত চিত্রঃ রাসেল মন্ডল স্থানীয় কৃষকলীগের কথিত নেতা পরিচয়ে বহুবছর ধরে ফুটপাতের দোকানপাট থেকে চাঁদাবাজি করে আসছেন। থানা পুলিশের নাম ভাঙ্গিয়ে রাসেল মন্ডল ওরফে মাখন প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

উত্তরার বিভিন্ন সড়কে ভাসমান ব্যবসার সাথে জড়িত ব্যক্তিদের সাথে কথা বলে জানাযায়, থানার বড় কর্তার নামে রাসেলের লোকজন দোকান প্রতি সর্বনিম্ন চার শত টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা পর্যন্ত ‘তোলা’ উঠাচ্ছেন। অভিযোগ আছে, স্থানীয় এক ওয়ার্ড কমিশনারের ছত্রছায়ায় রাসেল ওরফে মাখন চাঁদাাবজি সন্ত্রাসী কার্যকলাপ করে বেড়াচ্ছে। অন্য একটি প্রতিবেদনে তার বিস্তারিত প্রকাশ করা হবে।

রাসেল মন্ডল ওরফে মাখনের উত্থান
একসময় ফুটপাতে সামান্য গার্মেন্টস পন্য বিক্রি করা হকার মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে বনে গেছেন কয়েক কোটি টাকার মালিক। বাগিয়েছেন রাজনৈতিক পদ পদবি। চলাচলের জন্য রয়েছে একাধিক দামী গাড়ি- মোটরসাইকেল।

উত্তরার অন্যান্য লাইনম্যানদের সাথে আলাপকালে জানা যায়, ২০১৫ সালের শুরুর দিকে আজমপুর কসমো ফিলিং স্টেশনের আশে-পাশে ভ্যানে হকারী করে গেঞ্জি বিক্রি করতেন মাখন। পরবর্তীতে রবীন্দ্র সরণি সড়ক ও রাজউক কমার্শিয়াল কমপ্লেক্সের ফুটপাত দখলে রেখে পাদুকা বিক্রি শুরু করেন। পাশাপাশি তৎকালীন আজমপুর পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ আলমগীর গাজীর নামে উত্তরার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করেন।

উত্তরার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে গাজীপুরের ইছরকান্দিতে জমি ( খতিয়ান নং এস এ -২৭৬ আর এস ২২০), দক্ষিণখানের জামতলা সড়কের মুন্সিবাড়িতে ফ্লাট (বাড়ি নম্বর ৩৩), গ্রামের বাড়ি শেরপুরের বাদাতেঘরিয়া ইউনিয়নে কয়েক কোটি টাকার সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন উত্তরার শীর্ষ চাঁদাবাজ সন্ত্রাসী রাসেল মন্ডল ওরফে মাখন।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় থানা এবং উপ-পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে চাঁদাবাজি, নারী নির্যাতনসহ নানা অপকর্মের লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার হয়নি। তাই অনেকটা ক্ষোভ আর হয়রানি এড়াতে অভিযোগ করাই ছেড়ে দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।

রাসেলকে নিয়ে মিডিয়ার ভাবনা
একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেল গত ২৬ জুন ২০২৩ সালে রাসেল মন্ডল ওরফে মাখনের চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কার্যকলাপ এবং নারীবাজি নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বহু অপ্রকাশিত ঘটনা তুলে ধরেছিলেন। প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে রাসেলের নানা কুকীর্তি এবং উত্থানের স্ব-চিত্র প্রতিবেদনের পরপরই এই সন্ত্রাসী প্রকাশ্য চাঁদাবাজি ছেড়ে ‘গা’ ঢাকা দিয়েছেন।

সূত্র বলছে, যতই লোকচক্ষুর আড়ালে থাকুক, চাঁদাবাজি রাসেলকে করতেই হবে। তাই চাঁদাবাজির নতুন এক রোল মডেল আবিষ্কার করে দিব্যি লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়ে থাকছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।

থানা পুলিশের বিশেষ সুবিধাভোগী অফিসারের হয়রানি, মালামাল লুটপাট, দোকানের ভিট বেদখল হয়ে যাওয়ার ভয়ে সাধারণ ভ্রাম্যমাণ ব্যবসায়ী এবং হকাররা নাম প্রকাশ না করার শর্তে টাকা হাতিয়ে নেয়ার গুরুত্বপূর্ণ রোল মডেল সম্পর্কে বিস্তারিত জানিয়েছেন।

রাসেলের আবিস্কৃত চাঁদাবাজির মডেল
উত্তরায় প্রতিটি ব্যস্ত সড়কের ফুটপাতে একসাথে ৫০ টি দোকানের বেশি বসানো যাবে না। ফুটপাতে বসা দোকান থেকে হকাররা নিজেরাই টাকা উঠিয়ে রাখবেন। যে ব্যক্তিরা টাকা তুলে দিবেন তাদের দোকান ঐ দিন ফ্রীতে চলবে। তবে একজন সপ্তাহে দুই দিন টাকা তুলতে পারবেন অর্থাৎ দুইদিন তার চাঁদা দিতে হবেনা। তবে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এসে মন্ডলের মনোনীত লোকজন টাকা সংগ্রহ করে নিবেন।

ফুটপাতে কোন ঝামেলা হলে রাসেলের কাছ থেকে সরাসরি কোনা নির্দেশনা আসবে না। মনোনীত লোক মারফত তথ্য পৌঁছে যাবে হকারদের কাছে। চাঁদাবাজির নয়া কৌশলে ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকছেন রাসেল মন্ডল ওরফে মাখন।

চাঁদার টাকায় কেনা সম্পদের বাজার মূল্য
গাজীপুরে ক্রয়কৃত ৮.২৫ শতাংশ জমির আনুমানিক বাজার মূল্য কোটি টাকা, দক্ষিণখানের বনবিথী আবাসিক এলাকায় আলিশান ফ্লাট যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ৭৫ লক্ষ টাকা। রাজউক কমার্শিয়াল মার্কেটের তৃতীয় তলায় গার্মেন্টস পন্যের পাইকারি একাধিক দোকান ঘর, যেখানে জামানত হিসেবেই চুক্তি পত্রের বাহিরে দিতে হয় মোটা অংকের টাকা।

কাদের নিয়ন্ত্রণে ফুটপাত?
রাসেল মন্ডল ছাড়াও ‘উত্তরার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করে বিএনপি নেতা নোয়াখাইল্যা নবী; চাঁদপুরের মোটা দুলাল ও আতিক। চক্রটি পেশাদার চাঁদাবাজ। রাসেল ছাড়া বাকিরা প্রায় বিশ বছর যাবত চাঁদাবাজির সাথে জড়িত।

সূত্র বলছে, উত্তরার বিভিন্ন সেক্টরের অলিগলি এবং প্রধান সড়কে প্রতিদিন দুই হাজারের অধিক হকার দোকানপাট নিয়ে বসে। ভ্রাম্যমাণ এসকল দোকান থেকে প্রতিমাসে কোটি টাকার বেশি চাঁদা উঠানো হয়। চাঁদার বড় একটি অংশ স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ৭/৮ সদস্য ভাগাভাগি করে নিয়ে থাকেন।

বাকি টাকার ক্ষুদ্র অংশ কয়েকজন সাংবাদিক, লাইনম্যান এবং ক্যাডার ভিত্তিক রাজনৈতিক নেতা পরিচয়ে কিশোর গ্যাং এর পৃষ্ঠপোষক দক্ষিখান ও উত্তরখান থানার তালিকাভুক্ত অস্ত্র ও পুলিশ কোপানো মামলার আসামী ঠোঁটকাটা আলতাফসহ দু-একজন পেয়ে থাকেন।

দীর্ঘদিন ফুটপাতের টাকা উঠানোর দায়িত্বে থাকা কয়েকজনের সাথে আলাপ করে জানাযায়, প্রতিমাসে রাসেল, নবী, আতিক ও মোটা দুলাল চাঁদার যে পরিমাণ অংশ নিজেদের জন্য রাখেন তা প্রথম শ্রেণির সরকারি কর্মকর্তার বেতনের সমতূল্য বা তার চেয়ে অধিক।

ভ্রাম্যমাণ হকারদের অভিযোগ, উত্তরার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণের সাথে যেসকল ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন তাদের মধ্যে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সাথে সরাসরি যুক্ত রয়েছেন রাসেল মন্ডল এবং তার প্রধান ক্যাডার উজ্জল। রাসেল ওরফে মাখনের মদতে অস্ত্র ব্যবসায়ী ঠোঁটকাটা আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে মারপিট, মালামাল লুটপাটসহ নানা অপকর্মে লিপ্ত এই দুই চাঁদাবাজ।

মামলা হামলা
২০১১ সালের ২ মার্চ উত্তরার ৭ নং সেক্টরের ৩৫ নং সড়কে চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে প্রথম খুনের ঘটনা ঘটে। বীর মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল ইসলামের সন্তান মো. সেলিম (৩১) কে ঐ সময় চাঁদাবাজরা টাকার জন্য পিটিয়ে হত্যা করে। সেলিমের পিতা মুক্তিযোদ্ধা আমিরুল হত্যাকান্ডের একদিন পর অর্থাৎ ০৩ মার্চ উত্তরা পশ্চিম থানায় ৯ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন (মামলা নং ০৯)।

সূত্র বলছে, ঐ সময় জাকির মোল্লার নেতৃত্ব হাউজবিল্ডিং এলাকার ফুটপাত নিয়ন্ত্রণ করতেন দক্ষিণখানের রাজাবাড়ী এলাকার শফিক মিয়ার ছেলে উজ্জল। পুলিশের সাথে ভালো সম্পর্ক থাকায় হত্যা মামলার আসামী বনে যান প্রধান সাক্ষী। সেলিম হত্যার একযুগ পর অর্থাৎ মঙ্গলবার (১২ মার্চ ২০২৪) একই কায়দায় সুমন আলী নামের এক যুবককে পিটিয়ে মারার চেষ্টা চালায় উজ্জল বাহিনী।

হকারদের সাথে কথা বলে জানাযায়, শীর্ষ সন্ত্রাসী আলতাফ হোসেনের লোকজন বেশকিছু দিন যাবত সুমনকে অপহরণের চেষ্টা করে আসছিল। কত কয়েকমাস আগে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলতাফ সুমনকে পিটিয়ে রক্তাক্ত করে। ঐ সময় বিচারের নামে ৫০ হাজার টাকা আদায় করে ঠোঁট কাটা আলতাফ।

তাদের অভিযোগ, মঙ্গলবার রাতের ঘটনায় লইনম্যান রাসেল জড়িত রয়েছেন। ফুটপাতের একটা পাতাও রাসেলের কথা ছাড়া নড়াচড়া করানোর সুযোগ নাই। ঐ দিন মন্ডলের প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষ মদদে সুমন আলীকে দোকান থেকে অপহরণ করে কিশোর গ্যাং সদস্যরা।

তথ্য বলছে, সেলিমকে সেক্টরের যে স্থানে হত্যা করা হয় ঠিক তার পাশের সড়কেই (৩৪ নং সড়ক) রয়েছে চাঁদাবাজদের টর্চার সেল। আর সেখানেই সুমন আলীর উপর অস্ত্রশস্ত্র লোহার রড নিয়ে হামলে পড়ে অজ্ঞাত ৭/৮ যুবকসহ ইউসুফ, উজ্জল এবং মিলন। হামলার ঘটনায় সুমন আলী বাদী হয়ে আদালতে মামলা করেন( মামলা নং ০৯)

ব্যবসায়ী সেলিম (ছদ্মনাম) জানান, গত ২৪ ফেব্রুয়ারী ইউসুফ, উজ্জল ও মিলনসহ ২০/২৫ জন অজ্ঞাতব্যক্তি ধারালো অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সুমনকে হত্যার উদ্দেশ্যে মহড়া দিচ্ছিলেন। মহড়ার একটি ভিডিও ফুটেজ আমাদের কাছে সংরক্ষিত আছে। উত্তরা পশ্চিম থানাকেও বিষয়টি জানানো হয়েছে।

২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল রাতে উত্তরা পূর্ব থানার একটি সাধারণ ডাইরি থেকে জানাযায়, উত্তরার গডফাদার রাসেল মন্ডল ওরফে মাখন চাঁদার জন্য কাপড় ব্যবসায়ী মাসুমকে প্রকাশ্যে মারপিট এবং হত্যা চেষ্টা চালায়। পথচারীরা ঐ সময় তাকে উদ্ধার করে টঙ্গী মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করানোয় সে যাত্রায় প্রানে বেঁচে যায় মাসুম। কিন্তু সাধারণ ডাইরি করার কারণে মাসুমের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করে ফেলে লাইনম্যান রাসেল মন্ডল ওরফে মাখন।

চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপ নিয়ে গত মঙ্গলবার (১১ মার্চ) উত্তরা জোনের উপ-পুলিশ কমিশনার (ডিসি) মো. শাহাজাহান (পিপিএম), এক প্রশ্নের জবাবে চাঁদাবাজ এবং সন্ত্রাসীদের উদ্দেশ্যে কড়া হুশিয়ারী দিয়ে বলেন, ‘চাঁদা না দিয়ে পুলিশকে জানাবেন, আমরা তাদের ধরে নিয়ে আসবো।

এসময় তিনি স্থানীয় ব্যবসায়ীদের চাঁদা না দেয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বলেন, কোথাও যদি চাঁদার জন্য আপনাদের উপর জুলুম করে তাহলে আমাদেরকে জানাবেন। পুলিশ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।

মামলার বাদী সুমন আলীর মন্তব্য
হত্যা অপহরণ এবং টাকা পয়সা লুটপাটের ঘটনায় আদালতে মামলা করার পর থেকেই জীবন নিয়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছি। হাউজবিল্ডিং এলাকায় আলতাফ বাহিনীর ক্যাডাররা আমাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে। পেলেই হত্যা করবে। সুমনের অভিযোগ, আসামিরা প্রকাশে হত্যার হুমকি দিয়ে বেড়াচ্ছে। বৃহস্পতিবার সকালে (২৮ মার্চ) আমার ভ্যান গাড়ি আলতাফ হোসেন তার লোকজন দিয়ে আট নম্বর রেল গেইট এলাকায় তুলে নিয়ে গেছে। ওখানে পুকুর পাড়ে তার একটি বৈঠকখানা আছে।


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

কাব্যকস সুপার মার্কেট, ৩ ডি কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫।

মোবাইলঃ ০১৬২২৬৪৯৬১২, ০১৬০০০১৪০৪০

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com, tchitranews@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

Web Design & Developed By
A

তদন্ত চিত্র কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েব সাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।