TadantaChitra.Com | logo

১৪ই মাঘ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ | ২৮শে জানুয়ারি, ২০২২ খ্রিস্টাব্দ

মানবপাচারকারী চক্রের ০৩ নারীসহ ০৬ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪

প্রকাশিত : ডিসেম্বর ৩০, ২০২১, ১৫:৩৯

মানবপাচারকারী চক্রের ০৩ নারীসহ ০৬ সক্রিয় সদস্যকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব-৪

নিজস্ব প্রতিবেদকঃ এলিট ফোর্স হিসেবে র‌্যাব আত্মপ্রকাশের সূচনালগ্ন থেকেই আইনের শাসন সমুন্নত রেখে দেশের সকল নাগরিকের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার লক্ষে অপরাধ চিহ্নিতকরণ, প্রতিরোধ, শান্তি ও জনশৃংখলা রক্ষায় কাজ করে আসছে। সাম্প্রতিককালে প্রতারণামূলক ফাঁদে ফেলে উচ্চ বেতনে লোভনীয় চাকুরীর প্রলোভনে নারী পাচারে জড়িত রয়েছে কয়েকটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। জঙ্গীবাদ, খুন, ধর্ষণ, নাশকতা এবং অন্যান্য অপরাধের পাশাপাশি এসব ঘৃণিত মানবপাচারকারী চক্রের সাথে সম্পৃক্ত অপরাধীদের গ্রেফতার করে আইনের আওতায় নিয়ে আসার জন্য র‌্যাব সদা সচেষ্ট।

 

অতি সাম্প্রতিককালে মে ২০২১ মাসে পার্শ্ববর্তী দেশে বাংলাদেশের এক তরুণীর পৈশাচিক নির্যাতনের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এর প্রেক্ষিতে র‌্যাব পার্শ্ববর্তী দেশে মানব পাচারকারী চক্রের অন্যতম হোতা বস রাফিসহ চক্রের বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করে। এছাড়াও একজন মহিয়সী “মা” জীবনের সর্বোচ্চ ঝুঁকি নিয়ে নিজে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার হয়ে মেয়েকে পাচারকারীদের নিকট হতে উদ্ধারের ঘটনা প্রিন্ট ও সোশ্যাল মিডিয়াতে ভাইরাল হলে পাচারকারী চক্রের কাল্লু-সোহাগ @ কাল্লু-নাগিন সোহাগ @ মামা-ভাগিনা @ কালা-নাগিন সিন্ডিকেটের ০৩ সদস্যকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। এরপরই মধ্যপ্রাচ্যে মানব পাচারকারী চক্রের মূলহোতা লিটন @ ডাঃ লিটন আজাদকে গ্রেফতার করে র‌্যাব-৪। ভিন্ন কৌশলে মানব পাচারকারী চক্রের ডিজে কামরুল ও নূরনবী চক্রকে গ্রেপ্তারসহ তাদের সেইফ হাউজ ২৩ জন ভিকটিমকে উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও বেশকিছু প্রতারিত এবং নির্যাতিত ভিকটিমকে র‌্যাব-৪ এর উদ্দ্যেগে ফেরত আনা হয়েছে।

 

গত ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখে একজন ভিকটিমের মা ও মামা অধিনায়ক, র‌্যাব-৪ কে মোবাইলে কল করে জানায়, ভিকটিমকে পার্শ্ববর্তী দেশে মিডিয়া জগতে কাজ করার কথা বলে ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ এর যেকোন সময় পাচার করে দিবে এবং তারা ভিকটিমকে উদ্ধারে র‌্যাবের সহযোগীতা চায়। প্রাপ্ত সংবাদের ভিত্তিতে ২৯ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখ রাত ১১.০০ ঘটিকায় ঢাকা মহানগরীর দারুস সালাম থানাধীন রেড়িবাধ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে দীর্ঘদিন ধরে মানব পাচার করে আসছিল এরকম একটি পাচারকারী চক্রের মূলহোতাসহ ০৬ জনকে গ্রেফতার করে এলিট ফোর্স।

 

গ্রেফতারকৃতরা হলেন, ঢাকার বসবাসকারী মোঃ সেকেন্দার হোসেন (৩৫), যশোরের মোঃ আসাদুজ্জামান @ আকাশ (২৮), নরসিংদীর নুর মোহাম্মদ @ আলীফ (২৮), যশোরের মোসাঃ বুলবুলি বেগম (২২), নেত্রকোনা জেলার রুবি আক্তার (৩১), ও কলি আক্তার (২০)।

অভিযানে আধারকার্ড, প্যানকার্ড, মোবাইল এবং মানবপাচার সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র জব্দ করা হয়।

 

র‌্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেফতারকৃত আসামী রুবি ও কলি বিগত ০৪ বছর পূর্বে একজন পাচারকারীর কথায় প্রতারিত হয়ে অবৈধভাবে পার্শ্ববর্তী দেশে গিয়েছিলেন। পার্শ্ববর্তী দেশে যাওয়ার পর তাদেরকে একটি ড্যান্স বারে বিক্রয় করে দেয়। সেই থেকেই রুবি ও কলি ০৪ বছর ধরে ড্যান্স বারে আবদ্ধ ছিল। ড্যান্সবার থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে তারা। ড্যান্স বারে থাকা অবস্থায় পলাতক আসামী সোহাগের সাথে তাদের পরিচয় হয়।

 

পলাতক আসামী সোহাগ মাঝে মাঝেই পাচার করার উদ্দেশ্যে নারী নিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে যেত। গত অক্টোবর ২০২১ মাসে গ্রেফতারকৃত রুবি ও কলি আবার পার্শ্ববর্তী দেশে যেতে চাইলে পালাতক আসামী সোহাগ তাদেরকে মেয়ে যোগাড় করে দিতে বলে। পার্শ্ববর্তী দেশে পাচারের জন্য একজন ভিকটিম যোগাড় করে সোহাগের সাথে যোগাযোগ করলে সে তার চক্রের মূলহোতা সেকেন্দারের সাথে রুবি ও কলিকে পরিচয় করে দেয়।

 

পার্শ্ববর্তী দেশে মানব পাচারকারী চক্রের মূলহোতা গ্রেফতারকৃত সেকেন্দার হোসেন ও তার সহযোগী আসাদুজ্জামান @ আকাশ, নুর মোহাম্মদ @ আলিফ এবং বুলবুলি বেগম। এই চক্রে তাদের সহযোগী হিসেবে দেশে আরো ৫-৭ জন সদস্য রয়েছে। তাছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশে তাদের বেশ কয়েকজন সহযোগী রয়েছে। ইতোমধ্যে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ভারতীয় নাগরিক লাইনম্যান দীপক ও খোকা @ কংকাই এবং সহযোগী মারিয়া ও তামান্নাদের নাম পাওয়া যায়। বিগত কয়েক বছর ধরে এই চক্রটি সক্রিয়ভাবে মানব পাচারের মত অপরাধ করে আসছে। তারা পার্শ্ববর্তী দেশে বিভিন্ন মার্কেট, সুপারশপ, বিউটি পার্লারসহ বিভিন্ন চাকুরীর প্রলোভন দেখিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করত। তাদের মূল টার্গেট ছিল দরিদ্র ও নিন্মমধ্যবিত্ত তরুণী। এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদেশে গমন প্রত্যাশী নিরীহ মানুষকে টার্গেট করে। এই চক্রটি ভিকটিমকে সীমান্তের অরক্ষিত অঞ্চল দিয়ে রাতের আধারে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করে দেয়। মূলতঃ যৌন বৃত্তিতে নিয়োজিত করার উদ্দেশ্যেই ভিকটিমদের পাচার করা হত বলে গ্রেফতারকৃতরা জানায়। ভিকটিমদেরকে পার্শ্ববর্তী দেশে নেওয়ার পর সেখানে আটকে রেখে তাদেরকে পতিতাবৃত্তিতে বাধ্য করে অন্যথায় শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন সহ মেরে ফেলার হুমকি প্রদান করে। এই চক্রটি রাজাধানী ঢাকাসহ দেশের বেশ কয়েকটি এলাকায় সক্রিয় রয়েছে।

 

গ্রেফতারকৃতরা আরও জানায়, ভিকটিমদেরকে রংপুর, দিনাজপুর, ফেনী, কুমিল্লা, নবাবগঞ্জ, শরিয়তপুর, মাদারীপুর এবং ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে সংগ্রহ করে পার্শ্ববর্তী দেশে উন্নত চাকরি দেওয়ার নামে অবৈধ পথে দেশে পাচার করে। পার্শ্ববর্তী দেশের চক্রের সদস্যরা ভিকটিমদের ভূয়া কাগজপত্র তৈরি করে। পার্শ্ববর্তী দেশে উক্ত মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য দীপক খোকা @ কংকাই মুম্বাইতে সেইফহোমে ভিকটিমদের আটক রাখার মূল দায়িত্ব পালন করে থাকে এবং এ কাজে সহযোগীতা করে মারিয়া ও তামান্না। সেখানে অজ্ঞাত নামা আরও ২/৩ জন সদস্য রয়েছে। এ চক্রটি এ পর্যন্ত শতাধিক ভিকটিমকে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করেছে বলে জানা যায়।

 

জিজ্ঞাসাবাদে তারা আরো জানায়, ভুক্তভোগীদেরকে অবৈধভাবে স্থলপথে সীমান্ত পারাপার করানো হত। তারা কয়েকটি ধাপে পাচরের কাজটি সম্পাদন করত। প্রথমতঃ এ চক্রের মূলহোতা সেকেন্দার গ্রেফতারকৃত আসামী আসাদুজ্জামান ও বুলবুলি বেগমের মাধ্যমে অল্প বয়সী তরুণীদেরকে পার্শ্ববর্তী দেশে ভাল বেতনের চাকুরীর প্রলোভন দেখাত। প্রলুব্ধ ভিকটিমদের পরবর্তীতে দেশীয় সীমান্তবর্তী এজেন্ট পলাতক আসামী সোহাগ @ সাগরের কাছে বুঝিয়ে দেয়া হত। পলাতক আসামী সোহাগ ভিকটিমদেরকে সীমান্তবর্তী সেইফ হাউজে অবস্থান করাত। সুবিধাজনক সময়ে লাইনম্যানের মাধ্যমে তাদেরকে বেনাপোল সীমান্ত এলাকা দিয়ে পার করে দিয়ে ভারতীয় দালাল দীপক ও খোকা @ কংকাই এর কাছে বুঝিয়ে দিত। পাচারের ক্ষেত্রে অরক্ষিত অঞ্চল ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

 

গ্রেফতারকৃত সেকেন্দার ১৯৮৫ সালে যশোর জেলায় জন্মগ্রহণ করে। গত ১৫ বছর পূর্বে জীবিকার তাগিদে যশোর থেকে ঢাকা শহরে পাড়ি জমান। ঢাকা’তে এসেই এফডিসিতে পলাতক আসামী মেকআপ ম্যান সোহাগের সহকারী হিসেবে শুধু থাকা ও খাওয়ার বিনিময়ে কাজ শুরু করেন। তিন বছর কাজ শেখার পর সে নিজেই মেকআপ ম্যান হিসেবে কাজ শুরু করে। পলাতক আসামী সোহাগ মেকআপ ম্যানের কাজ ছেড়ে দিয়ে পর্শ্ববর্তী নারী পাচার কাজে যোগ দিলে সেকেন্দার মেকআপ ম্যানের আড়ালে তার সাথে নারী পাচারে যোগ দেয়। সেকেন্দার বিভিন্ন মাধ্যম থেকে নারী সংগ্রহ করে পলাতক আসামী সীমান্তবর্তী এজেন্ট সোহাগের কাছে হস্তান্তর করত। গ্রেফতারকৃত অপর আসামী আসাদুজ্জামান ও বুলবুলি বেগম তার মূল সহযোগী হিসেবে সেকেন্দারের কাছে মেয়ে যোগাড় করে দিত। পাচারের কৌশল হিসেবে সেকেন্দার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিকটিমদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সর্ম্পক গড়ে তোলে তাদেরকে মিডিয়া জগতে কাজ করার প্রস্তাব দিত। তার এই প্রস্তাবে ভিকটিমরা রাজি হলে তাদেরকে সে ঢাকায় আসতে বলত। ঢাকায় ভিকটিমদেরকে গ্রেফতারকৃত আসামী আসাদুজ্জামান ও বুলবুলি তাদের হেফাজতে রেখে ভিকটিমদেরকে পার্শবর্তী দেশে মিডিয়া জগতে কাজ কারার বিভিন্ন লোভনীয় প্রলোভন দেয়। ভিকটিমরা রাজি হলে এ চক্রের মূলহোতা সেকেন্দার তার সহযোগী নুর মোহাম্মদ এর সহযোগীতায় পলাতাক আসামী সোহাগের নিকট হস্তান্তর করে। এ পর্যন্ত তারা শতাধিক নারীকে এভাবে পার্শ্ববর্তী দেশে পাচার করেছে বলে জানা যায়। গ্রেফতারকৃত আসামী এই নারী পাচারকারী চক্রের মূলহোতা সেকেন্দারের নামে যশোর থানায় মানব পাচার প্রতিরোধ আইনে একটি মামলা চলমান রয়েছে।

 

গ্রেফতারকৃত আসামীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনানুগ কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন এবং এ নারীপাচারকারী চক্রের সাথে জড়িত অন্যান্য পলাতক আসামীদের গ্রেফতারে র‌্যাবের জোড়ালো অভিযান অব্যাহত থাকবে।


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

৪৭৩ ডিআইটি রোড তৃতীয় তলা, মালিবাগ রেইল গেট, ঢাকা-১২১৯

মোবাইলঃ ০১৬২২৬৪৯৬১২

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

তদন্ত চিত্র কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েব সাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।