TadantaChitra.Com | logo

৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ | ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

একই কর্মস্থলে ২৩ বছর: মাগুরায় এক ড্রাইভারের রাজকীয় জীবন কাহিনী!

প্রকাশিত : আগস্ট ২০, ২০২০, ১৬:৫৯

একই কর্মস্থলে ২৩ বছর: মাগুরায় এক ড্রাইভারের রাজকীয় জীবন কাহিনী!

মাগুরা প্রতিনিধিঃ মাগুরা পরিবার পরিকল্পনা বিভাগে এক ড্রাইভার এর রাম রাজত্ব চলছে। এই ড্রাইভার মাগুরা সদর উপজেলা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের একখানা এসি এ্যাম্বুলেন্স নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ এর মত ব্যবহার করে এবং অ্যাম্বুলেন্সটি বেসরকারি পর্যায়ে ভাড়া খাটিয় লক্ষ -লক্ষ টাকার মালিক বনে গেছেন।

এই ড্রাইভার এর নাম মামুন উর রশীদ। তিনি একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আজ ২৩ বছর মাগুরা সদর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ড্রাইভার পদে কর্মরত রয়েছেন। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ড্রাইভার মামুন নানা প্রকার অবৈধ কারবারের সাথে যুক্ত। তার সাথে মাগুরা শহরের কিছু গোল্ড স্মাগলার, মাদক ব্যবসায়ী ও মাদকসেবী যুব সমাজের বিশেষ সম্পর্ক বিদ্যমান। কথিত আছে, তিনি এইসব যুবককে ইয়াবা ও ফেনসিডিল সাপ্লায় করেন। ফলে এসব যুবক তার পেশাদার মাস্তান বাহিনী হয়ে কাজ করে থাকে।

সূত্র মতে, মাগুরা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের সরকারি এই অ্যাম্বুলেন্সটি মাসে মাগুরা টু ঢাকায় অন্তত ২০ বার ট্রিপ দিয়ে থাকে। প্রতিটি ট্রিপে সে ভাড়া আদায় করে ৬ থেকে ৯ হাজার টাকা । কিন্তু সরকারি কোষাগারে জমা দেয় দুই থেকে তিন হাজার টাকা । বাকি টাকা নিজেই হজম করেন। অন্যদিকে নতুন এই এ্যাম্বুলেন্সখানা মেরামত বাবদ প্রতিবছর ২/৩ লাখ টাকা বিল তোলেন।

সরকারি বিধিমতে এই এ্যাম্বুলেন্সটির ভাড়া ঢাকার বাইরে ওয়ানওয়ে প্রতি কিলোমিটার ১০ টাকা। সাথে ফেরি ভাড়া সংযুক্ত। কিন্তু এই ড্রাইভার কোনদিনই সেই ১০ টাকা কিলোমিটার দূরে কোথাও যান না। তিনি নিজের ইচ্ছামত দরদাম চুকিয়ে তবেই যান। মাগুরা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের তথ্য মতে, মাগুরা থেকে ঢাকার বাইরে রোগী নিয়ে যেতে হলে মেডিকেল অফিসার ( ক্লিনিক) এর পারমিশন নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ড্রাইভার মামুন সেই বাধ্যবাধকতা থোড়াই কেয়ার করেন। উর্ধতন কর্মকর্তার পারমিশন না নিয়েই অ্যাম্বুলেন্সটি যত্রতত্র ভাড়া খাটান।

অন্যদিকে ওভারটাইম না করেও ওভারটাইম বিলের লক্ষ লক্ষ টাকা উত্তোলন করেন। দীর্ঘ ২৩ বছর তিনি এই অফিসের দায়িত্ব পালন করায় অফিসটি তার পৈত্রিক সম্পদে পরিণত হয়েছে। মাগুরা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের একাধিক কর্মচারী এবং কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জানা গেছে, ড্রাইভার মামুন কখনোই ঠিকমতো সরকারী দায়িত্ব পালন করেন না।তিনি প্রায় সময়ই মাইক্রোবাস ষ্ট্যান্ডে অবস্থান করেন। গর্ভবতী মায়েদের আত্মীয়-স্বজন ফোন করে এ্যাম্বুলেন্স চাইলে তিনি বলেন, এ্যাম্বুলেন্স মাগুরার বাইরে ঢাকায় আছে। এই সুযোগে তিনি বলেন, আমার ছোট ভাইয়ের একখানা ভালো অ্যাম্বুলেন্স আছে সেটি পাঠিয়ে দিচ্ছি। এভাবে তিনি নিজের কেনা এ্যাম্বুলেন্স দিয়ে ভাড়া বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছেন।

তার বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ হল, তিনি প্রায়ই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সাথে মাস্তানসুলভ আচরণ করেন। তাদেরকে অসন্মান জনক হুমকি-ধামকি দেন। এমনকি গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেলার হুমকি দেন। এছাড়া মাদকাসক্ত মাস্তান দিয়ে তাদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করেন। তার নিয়ন্ত্রণে রয়েছে মাগুরা শহরের প্রায় শতাধিক মাদকাসক্ত সন্ত্রাসী যুবক। তিনি একটি ফোন দেয়া মাত্রই তারা পঙ্গপালের মত মাগুরা সদর মাতৃসদন কেন্দ্রে ও পরিবার পরিকল্পনা অফিসে ছুঁটে আসে। এ কারণে এই ড্রাইভার এর বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নিতে সাহস করেন না পরিবার পরিকল্পনা বিভাগের কর্মকর্তারা।

সূত্রগুলো আরো জানায়, মাগুরা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের এ্যাম্বুলেন্সটি বেসরকারি পর্যায়ে ভাড়া দেওয়ার জন্য তিনি সমগ্র জেলায় কিছু দালাল সেট করে রেখেছেন। মাগুরা, শ্রীপুর, মোহাম্মদপুর, শালিখা অঞ্চলের ওইসব দালালরা প্রতিদিন ভাড়া কন্টাক্ট করে দেন। বিনিময়ে তাদেরকে কমিশন দেন ড্রাইভার মামুন।

এছাড়া তিনি প্রায় সময়ই মাইক্রো বাস স্ট্যান্ডে অবস্থান করে ভাড়া ধরে থাকেন। তার বিরুদ্ধে সরকারি গাড়ীর তেল চুরির একটি অভিযোগ পাওয়া গেছে। মাগুরা সদর মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে অত্যাধুনিক এই অ্যাম্বুলেন্সটি ১ লিটার তেলে ১০ কিলোমিটার যেতে পারে। অথচ তিনি বলেন ৫ কিলোমিটার যায়।এভাবে তিনি তেল চুরি করেও মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন।

প্রশ্ন করলে তিনি বলেন, এই এ্যাম্বুলেন্সখানা এসি চালালে লিটারে ৫ কিঃ যায়। আর এসি না চালালে লিটারে১০ কিঃ যায়। কিন্তু যারা ভাড়া নিয়েছেন তাদের কাছ থেকে জানা যায়,তিনি কখনোই লংরোডে এসি চালান না। গত ২৩ বছর ধরে তিনি এই তেল চুরি কারবার করে আসছেন।

অন্যদিকে এই এ্যাম্বুলেন্সে রোগী বহনের সময় তিনি ইয়াবা ও ফেনসিডিল পাচার করেন মর্মে গুঞ্জন রয়েছে। এ পথেই তিনি আজ বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছেন এমন কথাও শোনা যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, ইতিপূর্বে উপ পরিচালক আমিনুল ইসলাম তার এসব দূর্নীতি-অনিয়ম ধরে ফেলেন এবং তাকে বদলির জন্য পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর প্রস্তাব পাঠান। এ কথা জানতে পেরে ড্রাইভার মামুন মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতাকে দিয়ে ডিডি আমিনুল ইসলামকে চরমভাবে অপমানিত করেন। এছাড়া মাদকাসক্ত যুবকদের দিয়ে ফোনে থ্রেট করেন।

অন্যদিকে মাগুরা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের কর্মকর্তা, ডাক্তার ও কর্মচারীদের সব সময় হুমকি-ধামকি দিয়ে আতংকে রাখেন। কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার বিরুদ্ধে কথা বললেই তাকে জঘন্যভাবে অপমান, অপদস্ত করেন।এভাবে সরকারী এ্যাম্বুলেন্স ভাড়া খাটিয়ে, তেল চুরি করে এবং ভুয়া ওভারটাইম বিল করে ড্রাইভার মামুন মাগুরার একজন বিত্তশালী ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছেন।

খোঁজ খবর নিয়ে জানা গেছে, তার বাড়ী মাগুরা জেলার আলমখালী রামনগর গ্রামে। তিনি মাগুরা জেলা আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতাকে আত্মীয় পরিচয় দিয়ে এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি করে মহাপ্রতাপে রয়েছেন। তিনি কিছুদিন আগে তার ছোট ভাই লিপুর নামে একখানা মাইক্রোবাস ও একখানা অ্যাম্বুলেন্স ক্রয় করেছেন। যার মূল্য কমপক্ষে ৬০ লক্ষ টাকা। অন্যদিকে তার গ্রামের বাড়ী এলাকায় ৩ বিঘা জমি ক্রয় করেছেন। তিনি মাগুরা শহরের একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ভাড়া নিয়ে বসবাস করেন। যার মাসিক ভাড়া ৯ হাজার টাকা। তার এই ফ্লাটে প্রায় কোটি টাকার আসবাবপত্র রয়েছে। মাগুরা সদর হাসপাতালে পশ্চিম পাশে প্যারাডাইস মেডিকেল সার্ভিসেস নামে নতুন একটি প্রতিষ্ঠান করেছেন। যার মুল্য কোটি টাকা। পার্শ্ববর্তী ঝিনাইদহ তিনি ৩ কাঠা জমি ক্রয় করছেন বলে গুঞ্জন আছে।

সূত্রগুলো আরো জানায় ,ড্রাইভার মামুন প্রতিমাসে মাগুরা টু ঢাকায় কমপক্ষে ২০টি ট্রিপ মারেন। প্রতিটি ট্রিপে ভাড়া আদায় করেন ৬ থেকে ৯ হাজার টাকা টাকা। অথচ তিনি সরকারি কোষাগারে ঐ পরিমান টাকা জমা দেন না। সরকারি কোষাগারে জমা দেন ২/৩ হাজার টাকা মাত্র। বাকি টাকা তিনি আত্মসাৎ করেন।

গ্রাহকদের ভাড়ার সরকারী রশিদ দেওয়ার নিয়ম থাকলেও তিনি তা কখনোই দেন না। কেউ জোরাজুরি করলে রেন্ট-এ-কার থেকে রশিদ এনে দেন। অথচ সরকারিভাবে রশিদ দেওয়ার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে জেলার বাইরে অ্যাম্বুলেন্সটি ভাড়ায় যেতে গেলে মেডিকেল অফিসার (ক্লিনিক) এর পারমিশন নেওয়া বাধ্যতামুলক। তিনি সেটাও নেন না। এ্যাম্বুলেন্সটিকে নিজের ব্যক্তিগত সম্পদ মনে করেন। গত বছর তিনি ভুয়া ওভারটাইম বিল করে প্রায় দেড় লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। কোন দিনই তিনি নাইট ডিউটি করেন না বা তাকে নাইটে পাওয়া যায় না। কোন রোগের অভিভাবক ফোন করলে তিনি বলেন, এ্যাম্বুলেন্স ঢাকায় রয়েছে। এভাবে তিনি সরকারের এই অ্যাম্বুলেন্সটি অবৈধ ব্যবহার করছেন।

মাগুরা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের ডাক্তার সাহানা সুলতানা তার এসব অবৈধ কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করায় তাকে মাস্তান বাহিনী দ্বারা শারীরিক নির্যাতন চালানোর চেষ্টা চালান। তার জীবনযাত্রা অবলোকন করে দেখা গেছে, ড্রাইভার মামুন সব সময় ব্র্যান্ডের পোশাক পরেন। তিনি প্রতিদিন পকেট খরচ করেন প্রায় হাজার টাকা। তার রাজকীয় জীবন যাপন দেখলে অনেকেই বিস্মিত হন। তিনি একজন চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী হয়ে কিভাবে এমন লাইফ লীড করেন সেটাই কারো বোধগম্য নয়। কেউ প্রশ্ন করলে বলেন, তাকে মাগুরা থেকে বদলি করার ক্ষমতা কারো নেই। এ পর্যন্ত যতবারই তাকে বদলি করার চেষ্টা করা হয়েছে ততোবারই তিনি রাজনৈতিক তদবির করে সেই প্রক্রিয়া বাতিল করেছেন। ড্রাইভার মামুনের হাত ইশারায় অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে।

তিনি মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের মেডিকেল অফিসার, এবং জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের উপ-পরিচালক, কাউকেই তোয়াক্কা করেন না। নিজের ইচ্ছা খুশিমতো অফিসে আসেন, হাজিরা খাতায় সই করেন, আবার বেরিয়ে যান। অপমান এবং শারীরিক নির্যাতনের ভয়ে কোন কর্মকর্তা বা কর্মচারী তার এই ফ্রিষ্টাইল জব সার্ভিসে বাধা দিতে পারেন না। সরকার যে উদ্দেশ্যে মাগুরায় এত দামী একটি অ্যাম্বুলেন্স প্রদান করেছে সেই উদ্দেশ্য সফলে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে ড্রাইভার মামুন। এসব বিষয় নিয়ে ড্রাইভার মামুনের সাথে কথা বললে তিনি দম্ভোক্তি করে বলেন,আমি ২৩ বছর ধরে এই অফিসে আছি। চাকরির শেষ জীবন পর্যন্ত এখানেই থাকবো। কারো ক্ষমতা নেই আমাকে এখান থেকে বদলী করে। বিধি মোতাবেক মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের এই অ্যাম্বুলেন্সটি জেলার মধ্যে গর্ভবতী মায়েদের মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রে আনা নেওয়ার জন্য সম্পূর্ণ ফ্রী সার্ভিস দেওযার কথা। কিন্তু ড্রাইভার মামুনের অ্যম্বুলেন্স বাণিজ্যের কারণে সেই সেবা থেকে মাগুরাবাসী বঞ্চিত হচ্ছে।

এ বিষয়ে মাগুরা জেলা পরিবার পরিকল্পনা অফিসের উপ-পরিচালক নিরঞ্জন বন্ধু দাম বলেন, এই ড্রাইভার এর বিরুদ্ধে অসংখ্য অভিযোগ রযেছে। সেগুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অচিরেই বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে মাগুরা মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্রের চার্জ অফিসার ডাক্তার নন্দ দুলাল বাবুকে প্রশ্ন করলে তিনি কৌশলে এড়িয়ে যান। দুই মেয়াদে তিনি আজ সাত বছর ধরে একই কর্মস্থলে কিভাবে চাকরি করছেন সেটাও কারো বোধগম্য নয়।

অন্যদিকে মা ও শিশু কল্যাণ কেন্দ্র এত আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ও দামি দামি মেশিনপত্র থাকা সত্তেও কেন সিজার এত কম হচ্ছে এ বিষয় আমাদের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। মাগুরাবাসী দুর্নীতিবাজ ড্রাইভার মামুনের বদলী ও তার অনিয়ম দুর্নীতি তদন্তের জোর দাবী তুলেছেন।

সংবাদটি শেয়ার করুন...


যোগাযোগ

বার্তা ও বানিজ্যিক কার্যলয়

৪৭৩ ডিআইটি রোড তৃতীয় তলা, মালিবাগ রেইল গেট, ঢাকা-১২১৯

মোবাইলঃ ০১৬২২৬৪৯৬১২

মেইলঃ tadantachitra93@gmail.com

সামাজিক যোগাযোগ

তদন্তচিত্র কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত। অনুমতি ছাড়া এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি ও বিষয়বস্তু অন্য কোথাও প্রকাশ করা বেআইনি।